কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়া পাঠানো হয়েছিল মো. শফিকুল ইসলামকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই তাঁর কাছ থেকে পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। অনলাইন প্রতারণার কাজে রাজি না হওয়ায় তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত ৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার পরিশোধের পর মুক্তি পান ৩০ বছর বয়সী এই যুবক।
রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। প্রায় আট বছর ধরে অগ্নিনির্বাপণসামগ্রীর ব্যবসা করছিলেন তিনি। ফেসবুকে মো. মাসুদ মিয়া নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান। একপর্যায়ে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলে তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।
শফিকুলের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় মোট ২২ দিন কাটানোর পর তিনি দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে ১৭ দিন তাঁকে একটি স্ক্যাম সেন্টারে বন্দী রাখা হয়। সেখানে নিয়মিত মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো, পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। এমনকি তাঁকে অন্যত্র বিক্রিরও চেষ্টা করা হয়েছিল।
কম্বোডিয়ায় যাওয়ার আগে শফিকুল কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ শিখেছিলেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে মাসুদের সঙ্গে সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি হয়। ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ডও পান। প্রথমে ১৬ অক্টোবর ফ্লাইট হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা ২৬ অক্টোবর করা হয়। ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটকে দেয় এবং প্রবাসী ডেস্ক থেকে স্মার্টকার্ড যাচাই করে আসতে বলে। শফিকুলের ভাষ্য, প্রবাসী ডেস্কের এক কর্মী সবার কার্ড স্ক্যান করে যাচাই করছিলেন; কিন্তু তাঁর পাসপোর্ট দেখে যাচাই ছাড়াই ছেড়ে দেন। পরে ইমিগ্রেশনে আবার গেলে পুলিশ অনুমতি দেয়।
কম্বোডিয়া পৌঁছানোর পর দেশটির ইমিগ্রেশন তাঁকে আটকে দেয় এবং পাসপোর্ট জব্দ করে রাখে। নমপেন বিমানবন্দর থেকে তিনি মাসুদের সহযোগী মোস্তফা মুকুল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্য শফিকুলের ফোনের বার্তাগুলো দেখেন। পরে তাঁর এমপ্লয়মেন্ট ভিসা পরিবর্তন করে ভ্রমণ ভিসা দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
নমপেন বিমানবন্দরের বাইরে মুকুলের সহযোগী আরিফ অপেক্ষা করছিলেন। অটোরিকশায় ৪০ মিনিট পর একটি আবাসিক ভবনে পৌঁছান শফিকুল। এর মধ্যে আরিফ ৮০০ মার্কিন ডলার নিয়ে নেন। রাতে কিছু খাবার খেতে দেওয়া হয় এবং বলা হয়, একটু পর ইন্টারভিউ হবে। রাত একটার দিকে শফিকুলের সঙ্গে আরও একজনকে গাড়িতে তোলা হয়। ২৭ অক্টোবর সকাল আটটায় থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি কমপ্লেক্সে পৌঁছান তাঁরা। সীমানাপ্রাচীর দেওয়া চত্বরের ভেতরে ছয়তলা তিনটি ভবন। তাঁদের দুজনের জায়গা হয় তৃতীয় তলায়, আর কাজের জায়গা পঞ্চম তলায়। শফিকুলের ভাষায়, পুরো চত্বর ছিল কারাগারের মতো — চারপাশে নিরাপত্তা প্রহরী, বের হওয়ার উপায় নেই। মুঠোফোন ও পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়। চীনা ভাষায় লেখা একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়। এরপর হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় দুটি স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে বলা হয়। ২৮ অক্টোবর থেকে কলিং রুমে কাজ শুরু হয়।
এই স্ক্যাম সেন্টারের চীনা মালিক এবং চালান পাকিস্তানিরা। দুটি বিভাগ — কলিং ও চ্যাটিং। কলিংয়ের চারটি ধাপ: প্রথমে দিনে তালিকা ধরে ৫০০ নম্বরে ফোন করে নাম, ঠিকানা যাচাই করা হয় — মূলত ভারতীয়দের টার্গেট করা হয়। দ্বিতীয় লাইনে আধার কার্ড যাচাই করা হয়। তৃতীয় লাইনে পুলিশ সেজে ভিডিও কল করা হয়, পুরো কক্ষ থানার আদলে সাজানো থাকে এবং হুমকি দেওয়া হয়। চতুর্থ ধাপে ব্যাংকের আদলে সাজানো কক্ষ থেকে জরিমানা ও পিন নম্বর চাওয়া হয়, এরপর ব্যাংক হিসাব হ্যাক করে সব অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। চ্যাটিং রুমে রাত ১১টা থেকে পরদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত কাজ করে দলটি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ডেটিং অ্যাপে মেয়েদের নামে ফেক প্রোফাইল খুলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলা হয়। ছেলেরা কথা বললেও সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপর প্রান্তে নারীর কণ্ঠ শোনানো হয়, যা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে।
দুই দিন কাজ করার পর ৩০ অক্টোবর শফিকুল ও ইশতিয়াক রাব্বী নামে আরেকজন কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাঁদের হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করা হয়। ওই দিন রাতেই ইন্টারভিউ হয় এবং রাব্বীকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। শফিকুলের ওপর শুরু হয় নির্যাতন — বৈদ্যুতিক শক, মারধর। বারবার বিক্রির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় চক্রটি। ১৬ নভেম্বর হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে দিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয়, যা সিয়েম রিয়েপের নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেয়। পাসপোর্ট ও মুঠোফোন ফেরত দেওয়া হয়। গাড়ির চালকের অনুরোধে তিনি একটি বাসস্ট্যান্ডে নামেন এবং সেখান থেকে নমপেনের টিকিট করে নেন।
দেশে ফিরে শফিকুল জানতে পারেন, তাঁর ছোট ভাই কম্বোডিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। তাঁরাই ৩ হাজার ২০০ ডলার পরিশোধ করে স্ক্যাম সেন্টার থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন। নমপেনে কমিউনিটির এক প্রতিনিধির বাসায় দুই দিন থাকার পর ১৮ নভেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফিরে দালাল মাসুদের সঙ্গে কথা হলে মাসুদ দাবি করেন, বিক্রির কথা তিনি জানতেন না এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেন। তবে এরপর থেকে মাসুদের আর খোঁজ নেই — অফিসও বন্ধ। শফিকুল এখন মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন; কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি, কোনো বিচার পাননি। সরকারের সহায়তা চান তিনি।




