জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়, যারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মনে করেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা সরকারের পতন কেবল একটি যুদ্ধের বিজয় ছিল; সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র গঠনের দীর্ঘ লড়াই এখনো বাকি। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, যা বর্তমান সরকারের জন্য পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে তিউনিসিয়া বা আরব বসন্তের দেশগুলোর অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করে বলেন, সেখানেও দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নিয়ম এবং কাঠামোর সমন্বয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং প্রশাসনের স্বাধীন কার্যকারিতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে বর্তমান সরকারকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা সামলাতে হচ্ছে। ২ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অবাধ ভোটাধিকার এবং পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ। নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতির চেয়ে বাস্তব অর্জন কম মনে হতে পারে, তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকারের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত নয়। ফলে ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কার্যপদ্ধতি নতুন করে আয়ত্ত করতে হচ্ছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রাজনৈতিক অধিকার ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং বিরোধী দলগুলো এখন সরকারের সমালোচনা করতে পারছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পূর্ববর্তী সরকারের ব্যাপক লুটপাটের প্রভাব এবং বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি সংকট। দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশে প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, সরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারের কাছে 'ফ্যামিলি কার্ড' পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবেন। এছাড়া ভিজিএফ ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি খাতের জন্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস দ্রুত উত্তোলন এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিতে প্রণোদনা ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশ যে পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল, সেখান থেকে উত্তরণ সহজ ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেক উন্নত। তখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, মাজার ভাঙচুর এবং শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের অফিসে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটলেও বর্তমান সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। যদিও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে, তবে সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন যে, এই সমস্যাগুলো গভীরে প্রোথিত এবং রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে সরকার উদাসীন নয়; ইতিমধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রী এবং একজন সংসদ সদস্যকে তাঁদের পদ ছাড়তে হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আইন অমান্যকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীদের আইনের অপব্যবহার সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো আইনকে কেবল পূর্ববর্তী সরকারের অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করা উচিত নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ভালো আইন দিয়েও হয়রানি করা সম্ভব, আবার সঠিক সদিচ্ছা থাকলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা সম্ভব। ভুল হলে তা সংশোধন করার মানসিকতাই গণতান্ত্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য। সবশেষে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণের সাথে নিয়ে এগিয়ে চলা এই সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফল হবে।




