বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা রয়েছে। একদিকে এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নিপীড়ক রাষ্ট্রবিরোধী সংগ্রামের প্রতিফলন সমৃদ্ধ এক অগ্রসর দলিল, অন্যদিকে এর কার্যপ্রক্রিয়া ক্ষমতাকে একজন ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত করে জনগণকে ক্ষমতাহীন করেছে। গণপরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংবিধান প্রণয়নের সময়েই এই ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত কাঠামোর সমালোচনা করেছিলেন। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই বৈপরীত্য বর্তমানে রাজনীতির প্রধান প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে একটি সংস্কারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল থেকে শুরু করে ভারত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ ও বিদ্রোহের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। এই আন্দোলনগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো তরুণ সমাজ, যারা বিদ্যমান বৈষম্য ও অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল অধিকতর ভয়াবহ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে কোটা সংস্কার এবং চূড়ান্ত গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত রাষ্ট্র কর্তৃক যে পর্যায়ের সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও গুলিবর্ষণ চালানো হয়েছে, তা বিশ্বের সাম্প্রতিক অন্য কোনো আন্দোলনে তেমন দেখা যায়নি।
বাংলাদেশে সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গতিশীলতার সংকট মূলত একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে—আর তা হলো বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা তরুণ সমাজের সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হওয়ায় এবং ক্ষমতা কতিপয়ের হাতে বন্দি থাকায় তরুণ উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা বুদ্ধিজীবীরা তাদের যোগ্যতার সঠিক পরিসর পাননি। বিশেষ করে গত সরকারের আমলে রাজনৈতিক পদোন্নতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল গুন্ডামি, যা সৃজনশীলতা ও মেধার বদলে নৃশংসতাকে উৎসাহিত করেছে। শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক চক্রের জিম্মি হয়ে সৎ উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
পঁচাত্তরের পর বিভিন্ন শাসকেরা সংবিধানে ধর্মীয় বা বাহ্যিক পরিবর্তন আনলেও এর মূল ক্ষমতাকাঠামো অপরিবর্তিত রেখেছেন। এর ফলে উৎপাদনশীলতার চেয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের সংস্কৃতি প্রকট হয়েছে। ফলে পরিশ্রমী ব্যবসায়ীর চেয়ে রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা অধিক সম্পদশালী হয়ে উঠেছেন, যা সমাজের সামগ্রিক সুযোগকে সীমিত করে দিয়েছে।
এই সংকট নিরসনে সংবিধান সংস্কার কমিশন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানো। তবে চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমান রাজনৈতিক সরকার ও আমলাতন্ত্রের একটি অংশ সম্পদের ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে আগ্রহী নাও হতে পারে।
গণ-অভ্যুত্থানের ফলে তৃণমূলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে পড়েছে, যা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তরুণদের এই সংঘাত কি প্রগতিশীল আন্দোলনের দিকে যাবে নাকি দঙ্গলবাজির নিপীড়ক সংস্কৃতিতে রূপ নেবে। যদি তরুণরা ইতিবাচক পথে দানা বাঁধতে পারে এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি অনুকূলে থাকে, তবেই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেখা সংস্কারের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায়, কাঠামোগত বিভাজন ও বৈষম্য আরও বাড়লে ভবিষ্যতে আরও বড় বিস্ফোরণের আশঙ্কা থেকে যায়।




