চব্বিশের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তার বিপরীতে একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুলের মতে, সংস্কারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া নয়, বরং সংস্কার ঠেকানোর একটি সুপরিকল্পিত প্রকল্প সফল হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ নিজেদের সুবিধা পুনর্বণ্টনের সুযোগ নিয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা দিশাহারা ছিল, তখন আমলাতন্ত্র অত্যন্ত দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের পর থেকে আগস্ট মাসের শেষার্ধ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পদোন্নতির হিড়িক দেখা দেয়। ১৩ আগস্টের পর থেকে শুরু করে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে শত শত সহকারী সচিব, উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পান। এমনকি কিছু কর্মকর্তা মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিন ধাপ পেরিয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়ে যান। এর পাশাপাশি অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৭৬৪ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি প্রদান করা হয়। অধ্যাপক মারুফুলের মতে, পৃথিবীর কোনো প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন নজির নেই এবং এটি একটি ‘তুঘলকি কাণ্ড’।
তিনি উল্লেখ করেন যে, গত দেড় দশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন, যা সত্য। তবে সেই বঞ্চনার প্রতিকার হওয়া উচিত ছিল স্বচ্ছ মানদণ্ড ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা হলো দলবদ্ধ চাপ ও রাতারাতি প্রজ্ঞাপনের কারসাজি। ফলে ব্যবস্থার পরিবর্তন না হয়ে কেবল সুবিধাভোগীর মুখ বদলেছে। তিনি ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতন্ত্রের তত্ত্ব উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ আমলাতন্ত্রের সেই সতর্কবাণীকেই সত্য প্রমাণ করেছে যেখানে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের স্থিতির নোঙর হওয়ার বদলে নিজের সুবিধাবাদী শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়। একে তিনি ‘ব্যুরো-প্যাথোলজি’ বা আমলাতান্ত্রিক ব্যাধি হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে নাগরিক সেবার চেয়ে প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্য প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খানের ‘মন্দ মুদ্রার সূত্র’ টেনে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, রাজনৈতিকভাবে অনুগত ও অযোগ্যরা যেভাবে যোগ্যদের কোণঠাসা করে, চব্বিশের পর তার একটি নতুন সংস্করণ দেখা গেছে। আনুগত্যের দিক পরিবর্তন হলেও আনুগত্যের অর্থনীতিটি একই রয়ে গেছে। যারা নিয়ম মেনে অপেক্ষা করেছেন তারা পিছিয়ে গেছেন, আর যারা দলবদ্ধ হয়ে চাপ দিয়েছেন তারা এগিয়ে গেছেন।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সুপারিশগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কমিশনের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বাধ্যতামূলক অবসরের বিরুদ্ধে কমিশনের মত থাকা সত্ত্বেও সেই বিধানেই কর্মকর্তাদের বিদায় করা হয়েছে। অন্যদিকে, নবম জাতীয় বেতনকাঠামোয় মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সব ক্যাডারের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করলেও সেবার মান বাড়ানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ক্যাডারগুলোর মধ্যে লড়াই চলছে কোটা ও বৈষম্য নিয়ে, কিন্তু জবাবদিহিতা বা নাগরিক সন্তুষ্টির বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।
অধ্যাপক মারুফুল ইসলাম মনে করেন, এটি মূলত মুশতাক খানের বর্ণিত ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ যা কেবল নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। হামজা আলাভির ‘অতিবিকশিত রাষ্ট্র’-এর ধারণার আলোকে তিনি বলেন, আমলা-অভিজাতরা এমন এক স্বতন্ত্র ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সংস্কারের চেয়ে তাদের সাথে সমঝোতা করা সহজ মনে করে।
এই স্থবিরতা কাটাতে তিনি পাঁচটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথমত, ২০২৪ সালের আগস্টের পর হওয়া সব পদোন্নতি একটি স্বাধীন প্যানেল দ্বারা যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা যাতে অস্বাভাবিক পদোন্নতি দ্রুত ধরা পড়ে। তৃতীয়ত, ই-নথির ড্যাশবোর্ড তৈরি করে সেবার মান ও ফাইলের স্থবিরতা পরিমাপ করা। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জবাবদিহির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান প্রকাশ করা। পঞ্চমত, বেতন বৃদ্ধিকে নির্দিষ্ট সেবা-মানদণ্ড পূরণের সাথে যুক্ত করা এবং সংসদের কাছে দায়বদ্ধ একটি স্থায়ী সংস্কার কমিশন গঠন করা।
পরিশেষে তিনি বলেন, সংস্কার না হওয়াটি একটি সফল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের ফল, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসন নাগরিকের পরিবর্তে দল বা কর্মকর্তার হয়ে কাজ করবে, ততক্ষণ জুলাইয়ের প্রকৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা সম্ভব হবে না।




