রাশিয়ার সামরিক ব্যয়ের চাপ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবনতির চিত্র এখন স্পষ্ট। শীর্ষ খুচরা ঋণদাতা সবারব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তারাস স্কভোর্সভ রুশ বেতারে জানিয়েছেন, অনেক ব্যাংকের হাতে সরকারি বন্ড কেনার নগদ অর্থ নেই। এর ফলে অর্থ মন্ত্রণালয় গত মাস থেকে বন্ড নিলামের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে; এটি ছিল সরকারের প্রধান অভ্যন্তরীণ ঋণের উৎস। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথমার্ধে নাগরিকরা ২৮ হাজার ৬৪ কোটি রুবেল (প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার) উত্তোলন করেছেন; জুলাইয়ে ৭৩০ কোটি এবং জুনে ৪৫০ কোটি ডলার উত্তোলনের পর এই ধারা আরও তীব্র হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর যে ২ হাজার ৪৭০ কোটি ডলারের উত্তোলন হয়েছিল, এবার তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই উত্তোলনের পেছনে জনগণের আতঙ্ক কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। একজন সাবেক অর্থ কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “ড্রোন উড়ছে। সবকিছু জ্বলছে। উদ্বেগ বাড়ছে। মানুষের দৈনন্দিন বুদ্ধিমত্তা হয়তো কাজ করছে যে, তাদের নগদ টাকা বালিশের নিচে রাখা উচিত, এমন কোনো ব্যাংকে নয় যেখানে তা কখনোই ফেরত নাও আসতে পারে।” তিনি আরও জানান, ব্যাংকগুলোর মূলধনের একটি বড় অংশ অন্যত্র ঋণে আবদ্ধ। পরিস্থিতিটি ‘ইটস অ্য ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আতঙ্কিত আমানতকারীরা নগদ দাবি করতে ভিড় করেন। তবে রাশিয়ার এই ব্যাংক রান ততটা নাটকীয় না হলেও, চলতি বছরের উত্তোলনের গতি ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। তখন রাশিয়া নগদে ভরপুর ছিল এবং আশা করেছিল যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে; কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় পর সেই হামলা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে যা ক্রেমলিনের অর্থনীতিকে চূর্ণবিচূর্ণ করছে।

বাজেট গভীর ঘাটতিতে ডুবে যাচ্ছে, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল প্রায় শূন্য হয়ে এসেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে কর বৃদ্ধি ভোক্তাদের চাপে ফেলেছে। মস্কো প্রতিরক্ষা শিল্পে ঋণের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু সেই ঋণের একটি বড় অংশ এখন খেলাপি হয়ে গেছে। আমানত হারানোর ফলে তৈরি হওয়া তরলতা সংকট এতটাই তীব্র যে, তা যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। সাধারণ নাগরিকরা আশঙ্কা করছেন, তাদের টাকা পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। সম্প্রতি সংসদে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বলেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা ১৩০ ট্রিলিয়ন রুবেল দেশের অর্থনৈতিক ও বাজেট সমস্যার সমাধানে ‘সমবেত’ করা উচিত। এর পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয় বেসরকারিভাবে পরিচালিত তহবিলে জমা ৪ হাজার কোটি ডলারের পেনশন সঞ্চয়ে প্রবেশের জন্য আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বছরই অলিগার্কদের ব্যবসা জাতীয়করণ করে রাষ্ট্র ৫ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। “যদি সরকারের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, পুতিন সরাসরি সম্পদ দখলে যাবেন। তিনি কিছুই পরোয়া করেন না,” একজন বিলিয়নিয়ারের সহযোগীর বরাত দিয়ে পোস্ট জানিয়েছে। “আর আমার ধারণা, সেদিকেই এগোচ্ছে।”

অর্থনৈতিক সংকটের সতর্কতা মাসের পর মাস ধরে জমা হচ্ছিল। ২০২৫ সালের জুনে রুশ ব্যাংকগুলো সম্ভাব্য ঋণ সংকট নিয়ে লাল পতাকা তুলেছিল, কারণ উচ্চ সুদের হারে ঋণগ্রহীতারা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একই মাসে রুশ শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা ইউনিয়নের প্রধান সতর্ক করেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ‘প্রায়-ডিফল্ট’ অবস্থায় আছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসেম্বরেই বলেছিল, ঋণের সমস্যা ও আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের প্রবণতা আরও খারাপ হলে অক্টোবরের মধ্যে ব্যাংকিং সংকট দেখা দিতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে কর্মকর্তারা পুতিনকে জানিয়েছিলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গ্রীষ্মের মধ্যেই আর্থিক সংকট হতে পারে। মে মাসে ইজভেস্তিয়া পত্রিকা জানিয়েছিল, বন্ড বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ এখন খেলাপির ঝুঁকিতে, কারণ কম সুদে ঋণ নেওয়া ব্যবসাগুলোকে এখন অনেক বেশি হারে পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। এ বছর পরিশোধযোগ্য ঋণের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা নগদ প্রবাহের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। জুনের একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলেছে, ঋণের বোঝা ও খারাপ ঋণের কারণে রুশ ঋণদাতারা দুর্বল; গত বছর দেউলিয়া ঘোষণাকারীর সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। “এই পরিস্থিতি একটি গতিশীল অর্থনীতির ভ্রম তৈরি করে, যা বাস্তবে একটি বিস্ফোরক অবস্থাকে লুকিয়ে রাখে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা তা উসকে দিতে পারে,” প্রতিবেদনটি যোগ করে, যা রয়টার্সের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

অর্থখাতের এই অবনতি যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ইউক্রেনের নতুন কৌশল ও ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থেমে গেছে, তেল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা প্রতিস্থাপনের হারের চেয়ে বেশি। ঠিক যেমন নগদ দখলের জন্য সরকার খুঁজছে, তেমনি সামরিক বাহিনীও সেনা সংখ্যার ঘাটতি পূরণে আরও লোক ‘ধরার’ পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে জোরপূর্বক নিয়োগের কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্র অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী ব্যাপক নিয়োগের পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়া প্রস্তুত করছে, তবে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ক্রেমলিন আগামী মাসের সংসদীয় নির্বাচনের পর পর্যন্ত তা ঘোষণা স্থগিত রাখতে পারে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে একটি নিয়োগ ঘোষণার পর লাখ লাখ পুরুষ জর্জিয়া ও কাজাখস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশে পালিয়েছিলেন। নতুন নিয়োগের গুঞ্জনে ইতিমধ্যে সীমান্ত পারাপারের হার বেড়েছে; জর্জিয়া ও আর্মেনিয়ায় সম্পত্তির দামও সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা জার্নালকে জানিয়েছেন। প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ফরচুন ডটকমে।