রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা GUR-এর হয়ে কাজ করা দুই গোপন সদস্যের বিরল অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে, যারা দাবি করেছেন যে তারা রাশিয়ার ভেতরেই সামরিক সম্পদ ও কর্মীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বিভিন্ন অন্তর্ঘাতক মিশনে যুক্ত ছিলেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি ডকুমেন্টারিতে এই গোপন জগতের কথা উঠে এসেছে, যা প্রস্তুত করেছেন স্বাধীন পোলিশ সাংবাদিক মার্সিন মামন।

'ইভান' ছদ্মনামের এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি রাশিয়ার ভেতরে থেকেই কৌশলগত বোমারু বিমান এবং অস্ত্র কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার কাজের মধ্যে ছিল সামরিক সাইটগুলোর নজরদারি করা এবং ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ গোপন করার নিরাপদ স্থান খুঁজে বের করা। ইভান জানান, একটি মাত্র সঠিক আঘাতে লক্ষ লক্ষ ডলার মূল্যের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব। তিনি সাংবাদিক মামনকে একটি ভিডিও দেখিয়েছেন যেখানে তাকে একটি রুশ সামরিক বিমান ঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখতে দেখা গেছে। ইভানের মতে, ধরা পড়লে তাকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দশকের পর দশক কারাবন্দি থাকতে হতে পারে। তিনি একজন প্রাক্তন রাজনৈতিক বিরোধী সদস্য এবং আদর্শিক কারণে এই ঝুঁকি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে, 'ফোমা' ছদ্মনামের অপর ব্যক্তিটি বর্তমানে পোল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তিনি রাশিয়ার ভেতরে থাকা একদল স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, যারা GUR-এর নির্দেশিত উচ্চপদস্থ রুশ কর্মকর্তাদের নজরদারি করে। ফোমা স্পষ্ট করেছেন যে, তার দল সরাসরি কোনো হামলায় অংশ নেয় না, বরং কেবল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। গত বছরের ডিসেম্বরে মস্কোতে লেফট্যানেন্ট জেনারেল ফানিল সার্ভারোভের হত্যাকাণ্ডের আগে তাকে নজরদারি করে তথ্য দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ফোমা। এক সময়ের রুশ অভিজাত শ্রেণির সদস্য হওয়ায় তার কাছে অনেক অভ্যন্তরীণ তথ্য ও যোগাযোগ সূত্র রয়েছে। তিনি তার ল্যাপটপে সামরিক গুদাম, সামরিক ইউনিট এবং কৌশলগত বোমারু বিমানের পাইলটদের বাসভবনের একটি ডেটাবেস দেখিয়েছেন। ফোমা জানান, তার এই নেটওয়ার্কে প্রায় তিন ডজন মানুষ কাজ করেন এবং তারা কেবল তাদেরই নজরদারি করেন যাদের তারা 'সামরিক অপরাধী' বলে মনে করেন।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা GUR এই দুই ব্যক্তির সাথে তাদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও, তথ্যের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার কারণে পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করেনি। ইভানের হ্যান্ডলার এমনকি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, ইভান কেবল ইউক্রেনের হয়েই কাজ করছেন কি না। তবে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ তাদের রণকৌশল হিসেবে রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন হামলা এবং গোপন এজেন্ট ব্যবহারের কথা আগে থেকেই স্বীকার করে এসেছে।

ফোমা ও ইভান উভয়েই পুতিন প্রশাসনের তীব্র বিরোধী এবং বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধের ফলাফলই পুতিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ইভানের মতে, বর্তমানে রাশিয়ার ভেতরে আদর্শিক কারণে কাজ করার মতো খুব কম মানুষ বাকি আছেন, কারণ অধিকাংশ মানুষ হয় দেশ ছেড়েছেন অথবা জেলখানায় বন্দি। ফলে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অর্থপ্রেরণা বা অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে এই নেটওয়ার্কের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই এবং সদস্যরা একে অপরের পরিচয় জানেন না। ইভান জানান, তৃতীয় কোনো দেশে গিয়ে লাই ডিটেক্টর টেস্টের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা হয়। এই বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও ইভানের মুখে ফুটে উঠেছে এক ধরণের আশাবাদ, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে রাশিয়ায় বসবাস করার অর্থই হলো সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে থাকা।