মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং বর্তমানে এক বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে তিনি লালগালিচা সংবর্ধনা এবং 'গার্ড অব অনার' পান, যা জান্তা সরকারের প্রতি প্রতিবেশী দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নির্দেশ করে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারকে পুনরায় আসিয়ান জোটের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে সহায়তার কথা জানিয়েছেন। মূলত মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার মিয়ানমার নাগরিক, যাদের বড় অংশই নিপীড়িত রোহিঙ্গা, তাদের প্রত্যাবাসন এবং শরণার্থী সমস্যা সমাধানের বিনিময়ে এই আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন মিন অং হ্লাইং।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তিনি থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ছাড়াও ভারত, চীন, রাশিয়া এবং বেলারুশ সফর করেছেন। প্রতিটি সফরেই তিনি তাঁর সরকারকে স্থিতিশীল এবং গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসরমান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন এবং বাণিজ্য ও অবকাঠামো চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছে, যদিও এর মূল কারণ মিয়ানমার থেকে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণা চক্র বন্ধ করা।

বিশেষজ্ঞ ব্রিজেট ওয়েলশ এবং খিন জও উইনের মতে, চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং শরণার্থী সমস্যা এড়াতে বাস্তববাদী স্বার্থের কথা চিন্তা করে জান্তা সরকারকে পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও বেলারুশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক অস্ত্র সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যার বিনিময়ে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে জান্তা সরকার। তবে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাত কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। রাখাইন, চিন এবং কাচিনসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্রোহী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধ এখনো তীব্র।

জান্তা প্রধানের এই কৌশলগত পদক্ষেপের মধ্যে একটি ছিল আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিকে (আইসিআরসি) অং সান সু চির সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া, যাকে সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক সাই কি জিন সোয়ে 'কম খরচে বড় প্রচারের লোকদেখানো উদ্যোগ' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বাইরের দেশগুলোর এই নরম কূটনীতি জান্তা সরকারকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যার প্রমাণ রাখাইন রাজ্যের বাজারে সাম্প্রতিক বিমান হামলা।

সাবেক কূটনীতিক লেটিটিয়া ভ্যান ডেন অ্যাসুম মনে করেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকারকারী জান্তা সরকারের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া জান্তা বাহিনীর পক্ষে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফিল রবার্টসনের মতো মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, আসিয়ানের পরবর্তী সভাপতি ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের উচিত শক্ত অবস্থান নেওয়া। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো দেশগুলোর উচিত বিমান জ্বালানি নিষিদ্ধ করার মতো সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জেনারেলদের বিচারের আওতায় আনা।