রাজশাহীর বাজারে গত ছয় মাসের ব্যবধানে পোলাওয়ের চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সময়ে যে চাল ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, বর্তমানে তার দাম বেড়ে ২০০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, তাদের দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে পোলাওয়ের চালের এমন তীব্র মূল্যবৃদ্ধি তারা আগে কখনও দেখেননি। অন্যদিকে, কৃষকদের দাবি, উৎপাদন মৌসুমে তারা যে দামে ধান বিক্রি করেছিলেন, বর্তমানে সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেলেও তাদের ঘরে আর কোনো ধান অবশিষ্ট নেই। ফলে বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির কোনো আর্থিক সুবিধা কৃষকেরা পাননি।

বাজার বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো বিদেশে চাল রপ্তানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি বড় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করেছে। মূলত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে এই পোলাওয়ের চাল তৈরি হয়, যার প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র দিনাজপুর। এছাড়া ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও এই ধানের চাষ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরে এবার ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তার মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য বেশি।

রাজশাহীর সাহেববাজারের ব্যবসায়ী অশোক প্রসাদ জানান, কোরবানির ঈদের পর থেকেই দামের এই উল্লম্ফন শুরু হয় এবং কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা দাম বেড়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তার মতে, রপ্তানি বন্ধ হলে বাজার স্বাভাবিক হতে পারে। একইভাবে পাইকারি ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন জানান, সরকার নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। তিনি আরও জানান, কোম্পানিগুলোর গুদাম থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হয় এবং তার সাথে পরিবহন খরচ ও কমিশন যুক্ত হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি দাম বেশি রাখা এবং মজুতের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।

ক্রেতাদের মাঝেও এই মূল্যবৃদ্ধি চরম হতাশার সৃষ্টি করেছে। জাহাঙ্গীর আলম খান নামের এক ক্রেতা জানান, পাঁচ মাস আগে তিনি ১৪০ টাকা কেজি দরে চাল কিনলেও এখন তাকে ২৩০ টাকা গুনতে হচ্ছে। রেস্তোরাঁ মালিক মো. গোলাপ সরদার জানান, তিনি ১৩০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তবে গ্রাহকদের কথা চিন্তা করে পোলাওয়ের দাম বাড়াতে পারেননি।

দিনাজপুরের কৃষক খালেদুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান জানান, ধান ওঠার সময় ৭৫ কেজির এক বস্তা ধান ৪ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। দাম যখন আরও বাড়ল, ততদিনে কৃষকদের হাতে কোনো ধান ছিল না। আড়তদার আতিয়ার রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, যে ধানের দাম শুরুতে ৪ হাজার টাকা ছিল, তা বর্তমানে বেড়ে সাড়ে আট হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে স্থানীয় ধানের ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো এবং প্রাণ অ্যাগ্রোর মতো বড় কোম্পানিগুলো এই সুগন্ধি চাল মোড়কজাত করে বাজারজাত করছে।