গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪.৫ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকের ৪.৩ শতাংশের তুলনায় বেশি। শক্তিশালী রপ্তানি খাতের ওপর ভর করে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা বেইজিংয়ের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার (৪.৫% থেকে ৫%) কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে তার প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

দ্য কনফারেন্স বোর্ডের এশিয়া প্যাসিফিক সিনিয়র ইকোনমিস্ট ম্যাক্স জেংলেইন মনে করেন, সরকারি প্রবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান সামগ্রিক অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন নয়। তার মতে, এই তথ্যের আড়ালে বিভিন্ন শিল্প, অঞ্চল এবং পরিবারগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদী মন্দার কারণে সাধারণ মানুষের সম্পদ কমেছে এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

অভ্যন্তরীণ মন্দার মাঝেও রপ্তানি খাত চীনের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৯৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর এবং হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক গাড়ির মতো উচ্চ-প্রযুক্তি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে চীন এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইউরোপের বাজারের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করায় চীন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক দামে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহ করছে।

তবে এই রপ্তানি-নির্ভর মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপি পারিবাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট একাতেরিনা বিগোস। তিনি জানান, প্রযুক্তি-চালিত এই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধিতে বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তেমন ভূমিকা রাখছে না, উল্টো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে চাকরির ঝুঁকি বাড়ছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এসোয়ার প্রসাদ মনে করেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটি যদি কেবল বিদেশি চাহিদার ওপর নির্ভর করে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তার মতে, চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হওয়ার বদলে বরং বিশ্ব প্রবৃদ্ধির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বর্তমানে চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে অত্যন্ত তৎপর। প্রতিদিন গড়ে ১.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে ইইউ। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ইউরোপে চীনের রপ্তানি ১৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি হাইব্রিড গাড়ির আমদানি অর্ধেক করার বিষয়ে চীনের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছালেও ইইউ আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।

এদিকে, ডাচ ব্যাংক আইএনজি-র প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং মনে করেন, কিছু চুক্তি হলেও দ্রুত বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। অনেকে দাবি করছেন, ডলার ও ইউরোর বিপরীতে চীনা মুদ্রা 'ইউয়ান'-এর মান কম রাখা হয়েছে, যা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, যদিও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতির বিপরীতে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং জানিয়েছেন, বেইজিং বড় কোনো বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চায় না। তিনি বিশ্বাস করেন, বাণিজ্য ঘাটতি ও উদ্বৃত্ত থাকা দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং চীন অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।