দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন শিল্পে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছে, তবে এই পর্যটনের সিংহভাগই সীমাবদ্ধ রয়েছে রাজধানী সিউলে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং পর্যটকদের সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পাঁচটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন পর্যটন হাব তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটি। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা রেকর্ড গড়ে ১৮.৯ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের সর্বোচ্চ ১৭.৫ মিলিয়নের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে পর্যটকদের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে সিউলের ইতায়েওন এবং সংসু-দংয়ের মতো জনপ্রিয় এলাকাগুলোর প্রতি।

ম্যাকাওতে অনুষ্ঠিত 'গ্লোবাল ট্যুরিজম ইকোনমি ফোরাম' (GTEF)-এ দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন উপমন্ত্রী দাহিউন কিম জানান, অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক কোরিয়ান সংস্কৃতির টানে এ দেশে এলেও তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ রাজধানী সিউল এবং এর আশেপাশের অঞ্চলের বাইরে ভ্রমণ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, পর্যটকদের স্থানীয় এলাকাগুলোতে উৎসাহিত করতে হলে সিউলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই গিমহে, ডায়েগু, চেংজু, মুয়ান এবং ইয়াংইয়াং—এই পাঁচটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে পর্যটন হাব গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

কেবল অবকাঠামো নয়, বরং কে-ওয়েভ (K-wave)-এর জনপ্রিয়তাকে গ্রামীণ গন্তব্যের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করছে সিউল প্রশাসন, যাতে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছায়। উপমন্ত্রী দাহিউন কিমের মতে, জনপ্রিয় নাটক ও সিনেমার শুটিং লোকেশন, স্থানীয় উৎসব এবং আঞ্চলিক খাবারকে এমন অনন্য অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করা হচ্ছে, যা পর্যটকরা কেবল নির্দিষ্ট ওই অঞ্চলগুলোতেই উপভোগ করতে পারবেন। গত ১৩ বছরে দেশের ১৪৭টি বিভিন্ন অঞ্চলে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ট্যুর প্রোগ্রামসহ প্রায় ১,৪০০টিরও বেশি পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়া নয়, এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও এখন তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের শহরগুলোর পর্যটন উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনে পর্যটকরা এখন বেইজিং বা সাংহাইয়ের মতো প্রথাগত প্রবেশপথ ছেড়ে চেংদু ও চংকিংয়ের মতো শহরে ঝুঁকছেন। চংকিং শহরটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'সাইবারপাঙ্ক সিটি' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এমজিএম চায়নার চেয়ারপারসন ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর প্যানসি হো জানান, চীন এখন 'এক যাত্রা, বহু গন্তব্য' ধারণাকে উৎসাহিত করছে, যার ফলে পর্যটকরা বেইজিংয়ের গ্রেট ওয়াল থেকে শুরু করে শিয়ান এবং হাংঝু পর্যন্ত ভ্রমণ করছেন।

এই প্রবণতার সুযোগ নিচ্ছে বিমান সংস্থাগুলোও। মালয়েশিয়া ভিত্তিক এভিয়েশন কোম্পানি 'ক্যাপিটাল এ'-এর সিইও টনি ফার্নান্দেজ উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে তার কোম্পানির জন্য দিল্লি বা মুম্বাইয়ের মতো বড় রাজধানীগুলোর চেয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির শহরগুলো বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে। তার মতে, এসব শহরের জিডিপি এবং মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অথচ তারা আগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তিনি উদাহরণ দেন চীনের গুয়াংডং প্রদেশের শান্তৌ শহরের কথা, যেটির জনসংখ্যা কুয়ালালামপুরের চেয়েও বেশি। বর্তমানে কুয়ালালামপুর থেকে শান্তৌতে দিনে তিনবার ফ্লাইট পরিচালনা করছে তার প্রতিষ্ঠান।