দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার কথা ভেবে ইউরোপের অনেক দেশ তাদের স্বর্ণের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিল। তবে বর্তমান সময়ের অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এখন সেই রিজার্ভ পুনরায় বিন্যাস করছে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (De Nederlandsche Bank বা DNB) উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপে স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী রিজার্ভ পুনর্distributions-এর একটি বড় ট্রেন্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ মার্কিন সরকার, বিভিন্ন বিদেশি সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বর্ণের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করে আসছে। যুদ্ধের সময় ও পরবর্তী সময়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ এখানে জমা হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে এই মজুত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও, ডলারের সাথে স্বর্ণের মান সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বর্তমানে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রায় অর্ধেক। যুক্তরাষ্ট্রের এই তত্ত্বাবধানের প্রবণতা আরও হ্রাস পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ফ্রান্স তাদের সমস্ত স্বর্ণ নিউ ইয়র্ক ফেড থেকে সরিয়ে নিয়েছে। একইভাবে, নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউ ইয়র্ক থেকে ৭৮ টন এবং কানাডা থেকে ৭ টন স্বর্ণ লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং সংকটকালীন প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডিএনবি। ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন জানান, লন্ডন বিশ্বের বৃহত্তম বুলিয়ন ট্রেডিং হাব হওয়ায় সেখানে স্বর্ণ রাখা বেশি সুবিধাজনক এবং সহজলভ্য হবে। যদিও তিনি আশা করেন যে এই স্বর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না, তবুও স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। ২০০০ সালে জার্মানি লন্ডন থেকে ৯৩০ টন স্বর্ণ ফ্রাঙ্কফুর্টে স্থানান্তর করে। এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নিউ ইয়র্ক এবং প্যারিস থেকে আরও ৬৭৪ টন স্বর্ণ ফ্রাঙ্কফুর্টে নিয়ে আসা হয়। ২০১৪ সালে নেদারল্যান্ডস নিউ ইয়র্ক থেকে ১২২.৫ টন স্বর্ণ আমস্টারডামে এবং ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অস্ট্রিয়া লন্ডন থেকে ৯০ টন স্বর্ণ স্বদেশে ফিরিয়ে আনে। ইউরোপের বাইরেও এই প্রবণতা দেখা গেছে; ২০১১-২০১২ সালে ভেনেজুয়েলা ১৬০ টন স্বর্ণ প্রত্যাবাসন করে এবং ২০২৩ সাল থেকে ভারত তাদের স্বর্ণ স্থানান্তরের গতি ত্বরান্বিত করেছে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র অ্যানালিস্ট কৃষাণ গোপাল জানান, স্বর্ণের এই স্থানান্তর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। বর্তমান সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেবল নিরাপত্তার কথা ভাবছে না, বরং তারা তিনটি বিষয়ের সমন্বয় করছে: কাস্টডি ঝুঁকি, শারীরিক সহজলভ্যতা এবং বাজারের তারল্য। বিশেষ করে জার্মানি এবং ইতালির আইনপ্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে আরও স্বর্ণ সরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। এর পেছনে ইউরোপের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকূল মনোভাব এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মতো বিষয়গুলো প্রভাব ফেলছে। তবে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বর্ণের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি নিলে তা বিশ্ব আর্থিক বাজারের আস্থাকে নষ্ট করবে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি করবে। গোপালের মতে, এই স্থানান্তর মানেই যে ব্যাংকগুলো স্বর্ণ বিক্রি করতে চায় তা নয়, বরং তারা নিজেদের রিজার্ভকে আরও নির্ভরযোগ্য এবং ট্রেডেবল করতে চাইছে।




