চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বন ও পাহাড়ি ভূমি রক্ষার লড়াই এখন চরম সংকটে। সরকারি জমি ও বৃক্ষ উদ্ধার অভিযানে নামলেই সশস্ত্র দল জড়ো হয়ে বনকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। কার্যালয় অবরোধ, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া, এমনকি হত্যার হুমকি—সবই ঘটছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় এখনো প্রায় দুই হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে রাঙ্গুনিয়ায় বন, পাহাড় ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন মন্ত্রী হাছান মাহমুদের অনুসারীদের হাতে। ওই সময় শুধু রাঙ্গুনিয়াতেই বন বিভাগের ২১২ একরের বেশি জমি বেদখল হয়েছিল, যার বড় অংশ দখলে নিয়েছিলেন হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদ মাহমুদ। সরকারের পতনের পর আগস্ট মাসে (২০২৪) এরশাদ মাহমুদের দখলে থাকা প্রায় ২০০ একর জমি উদ্ধার করা হলেও দখল ও পাচার পুরোপুরি থামেনি।
বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অবশিষ্ট বনভূমি দখলে জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের তালিকায় নাম এসেছে চন্দ্রঘোনার ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আহমদুল হক, লিচুবাগান সিএনজিচালক সমিতির সভাপতি ও বিএনপি কর্মী আবদুল মান্নান ওরফে মনু, যুবদল কর্মী জুয়েল, তাঁর ভাই মো. সোহেল এবং কেফায়েত উল্লাহর। তবে আহমদুল হক এই অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো দাবি করেছেন, তিনি বন বিটের সম্পদ রক্ষা করেছেন। আবদুল মান্নান ও জুয়েলও ফোনে যোগাযোগে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, জুয়েলের ব্যবহৃত একটি কাঠবাহী গাড়ি বিজিবি আটক করে কাপ্তাই বন বিভাগের কাছে জমা দিয়েছিল। সোহেলের বিরুদ্ধে দখলকৃত বনভূমিতে নির্মিত ঘরবাড়িতে ইট-বালু সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
হামলার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৫ সালের ৭ মার্চ রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি কোদালা বিট কর্মকর্তা খোন্দকার মাহাবুবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কার্যালয়ে আটকে বাইরে থেকে তালা দেয়। তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলাকারীদের হাতে দা, কিরিচ, ছুরি ও লোহার রড ছিল। ওই রাতে চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের দক্ষিণ জঙ্গল নিশ্চিন্তপুর এলাকার সেগুনবাগান থেকে ২৪টি সেগুনগাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। থানা-পুলিশ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে বনকর্মীদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। এর আগে কোদালা বন বিটের সাবেক ডেপুটি রেঞ্জার কে এম মাহমুদুল হাসান একটি অভিযানে গিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানোর শিকার হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে অন্য কর্মীরাও মারধর ও হুমকির মুখে পড়েছেন।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন, দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর ও গলাচিপা, কোদালা, নারিশ্চা, চিরিঙ্গা, পোমরা ও নিশ্চিন্তপুর বন বিট—সবখানেই প্রায় একই চিত্র। পাহাড়ের গায়ে মাটি কাটার ক্ষত, নতুন বসতি, কাটা গাছের গোড়া—সবই দৃশ্যমান। স্থানীয়রা জানান, রাতে ট্রাকে করে মাটি ও কাঠ সরানো হয়; কোনো কোনো রাতে শতাধিক ট্রাক চলাচলের কথা শোনা যায়। প্রায় ৩ হাজার ৩০০ একর আয়তনের কোদালা বন বিটের বেশির ভাগই পাহাড়ি বনভূমি। চন্দ্রঘোনা বনগ্রাম, সেগুনবাগান, কলাবাইজ্যাঘোনা, বটতলী, ধুইল্যাছাড়ি ও মহুত্বেরঘোনা এলাকায় ব্যাপক দখল ও পাচারের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বন বিভাগ বলছে, দখলকারীদের সশস্ত্র লোকবল ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। সীমিত কর্মীর পক্ষে প্রতিরোধ কঠিন। কোদালা বিটে একজন ডেপুটি রেঞ্জারসহ মাত্র চারজন দায়িত্ব পালন করছেন। গত দেড় বছরে অভিযানের সময় প্রায় ৩০টি গুলি ছুড়তে হয়েছে; দখলকারীরাও পাল্টা গুলি চালিয়েছে। এর আগে দুই বছরে কোদালা বিটে মাত্র দুটি গুলি ছোড়া হয়েছিল। গুলি চালিয়েও দখল পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না—একটি দলকে সরালে অন্য পরিচয়ে আবার ঘর ওঠে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, মাঝেমধ্যে উদ্ধার অভিযানে গেলে হামলার চেষ্টা হয়। সম্প্রতি ধোপাছড়িতে এমন ঘটনা ঘটে। তবে তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া হয় এবং থানা-পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সাহায্য নেওয়া হয়। চিরিঙ্গা বন বিটের ফরেস্ট গার্ড খোকন দাস জানান, এলাকায় প্রচুর খুনোখুনি হয়, তাই সবাইকে ঝুঁকিতে থাকতে হয়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাঙ্গুনিয়া থানায় অন্তত ১০টি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বন কর্মকর্তারা। অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে লোকজন জড়ো হয়ে বাধা দেয়, অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণের চেষ্টা করে—এতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা নেতৃত্ব দেন বলে ডায়েরিতে উল্লেখ আছে। বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, বর্তমান গতিতে বন উজাড় ও পাহাড় কাটার কাজ চললে ১০ বছর পর এই এলাকায় আর বন অবশিষ্ট থাকবে না। চলতি বছরে শুধু কোদালা বিটেই ১০০টির বেশি ঘর ওঠানোর চেষ্টা হয়েছে। তাঁর মতে, এখন ঘরে ঘরে নেতা। রাজনৈতিক উদ্যোগ না থাকলে শুধু বন বিভাগের পক্ষে এই বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, দখলকারীরা বড় দল নিয়ে চলে এবং অনেকের কাছে অস্ত্র থাকে। অল্পসংখ্যক বনকর্মীর পক্ষে তাদের সামনে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বন দখলমুক্ত করতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন; তবে তার আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কোনো দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ বন দখল করতে পারবে না।




