বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি) রাজশাহীর বিভিন্ন সীমান্ত ও চরাঞ্চল থেকে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ প্রত্নসম্পদ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই সংগ্রহের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিরল নিদর্শন হিসেবে পাওয়া গেছে সূর্যপুত্র রেবন্তর একটি ভাস্কর্য। প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ও অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক মোশারফ হোসেনের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেলে পাথরের তৈরি এই মূর্তিটি সপ্তম শতকের হতে পারে।

হিন্দু ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, রেবন্ত বা রৈবত হলেন সৌর দেবতা সূর্য ও সংজ্ঞার কনিষ্ঠ সন্তান, যাকে সাধারণত ঘোড়ায় চড়ে তির-ধনুক বা তলোয়ার হাতে শিকারির বেশে চিত্রিত করা হয়। মধ্যযুগীয় পূর্ব ভারত, বিশেষ করে বর্তমান বাংলা ও বিহার অঞ্চলে রেবন্তর উপাসনার ব্যাপক প্রচলন ছিল, যার প্রমাণ ষষ্ঠ শতক থেকেই পাওয়া যায়। উদ্ধারকৃত ভাস্কর্যে রেবন্তর পাশাপাশি তাঁর অনুচরদের উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে, যেখানে কেউ রাজকীয় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

রেবন্তর মূর্তি ছাড়াও এই সংগ্রহে আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য রয়েছে—নবম থেকে দশম শতকের একটি জৈন তীর্থংকর মূর্তি এবং একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের একটি অপরাজিতা মূর্তি। গবেষকদের মতে, জৈন তীর্থংকর মূর্তির প্রাপ্তি প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলে জৈনধর্মের চর্চার এক অমূল্য প্রমাণ। এছাড়া অপরাজিতা মূর্তির শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য তৎকালীন ভাস্কর্যরীতির উৎকর্ষতা ফুটিয়ে তোলে। জাতীয় জাদুঘর আরও জানিয়েছে যে, সংগ্রহে থাকা বেলে পাথরের দেবী চামুণ্ডা, নটরাজ শিব এবং কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তিগুলো মূলত ১১-১২ শতকের শৈলীর প্রতিনিধিত্ব করে। তবে পিতলের তৈরি রাধামূর্তিটি প্রাচীন নয়, বরং ১৯-২০ শতকের লোকশিল্পের নিদর্শন বলে মনে করা হচ্ছে।

পদ্মার চরাঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ৮১৮টি ধাতব মুদ্রার বিষয়ে মুদ্রা তাত্ত্বিকদের মতে, এগুলো ব্রিটিশ আমল, ঔপনিবেশিক ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের সংকলন। এছাড়া সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ শিবলিঙ্গ, প্রাচীন শিল-পাটা এবং বিভিন্ন ভাস্কর্যের খণ্ডিত অংশ।

এই অমূল্য সম্পদগুলো জাতীয় জাদুঘরের স্থায়ী হেফাজতে আনার প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ। বিজিবি ব্যাটালিয়নের সংরক্ষণাগার আধুনিক ও নিরাপদ না হওয়ায় সম্পদগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল। ফলে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পর জাদুঘরের চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল রাজশাহী থেকে এই নিদর্শনগুলো সংগ্রহ করে শাহবাগে নিয়ে আসে।

নিদর্শনগুলোর মূল উৎস রাজশাহীর ছয়টি এলাকা—গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট, কাটাখালী, বেলপুকুর এবং দামকুড়া। বিশেষ করে গোদাগাড়ীর সাতপুর আমবাগান থেকে বিষ্ণুমূর্তি এবং বাঘার পাকুরিয়া থেকে ১৫৬ কেজি ওজনের চামুণ্ডামূর্তি উদ্ধার করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিদর্শনগুলো প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্পকলা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থানের নিখুঁত সাক্ষ্য দেয়।

জাতীয় জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই নিদর্শনগুলোর রাসায়নিক পরিচর্যা এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। সংরক্ষণ এবং তথ্যফলক তৈরির কাজ শেষ হলে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। তবে বর্তমানে গ্যালারির সংকটের কারণে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত না থাকলেও, ভবিষ্যতে সক্ষমতা বাড়লে তা ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন কিপার মনিরুল হক।