মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর বেউথা ঘাটের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে আয়োজিত হলো এক জমকালো নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। জেলা বিএনপির তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। গ্রামবাংলার এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে পরিচিত করতে এবং ঐতিহ্য রক্ষা করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়।

শনিবার সকাল থেকেই এই রোমাঞ্চকর ইভেন্ট দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার পাশাপাশি ঢাকা, সাভার, ধামরাই, নবাবগঞ্জ, দোহার এবং টাঙ্গাইলের নাগরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে জড়ো হন। দুপুরের পর নদীর দুই পাড় যেন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোর এবং বিভিন্ন বয়সী মানুষ পরিবারের সাথে এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য উপভোগ করেন।

প্রতিযোগিতায় মোট ২২টি নৌকা চারটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে অংশ নেয়। এর মধ্যে খেল্লা-গয়ইটা ১০টি, ঘাসি-ছিপা ৫টি, ছান্দি ৪টি এবং পানসি নৌকা ছিল ৩টি। এছাড়া প্রদর্শনী হিসেবে ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও নদীতে নেমেছিল। এই বাইচের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে আসা খেল্লা নৌকা ‘মায়ের দোয়া’। ভারতের শাল কাঠ দিয়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নৌকাটি গত ৩০ সেপ্টেম্বর রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়ন থেকে যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন নদীপথ পাড়ি দিয়ে তিন দিন পর এটি মানিকগঞ্জের বেউথা ঘাটে পৌঁছায়। নৌকার পরিচালক মজিবুর রহমান জানান, এটিই ছিল এই নৌকার প্রথম প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ।

ফলাফলের হিসেবে, খেল্লা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোটরসাইকেল জয় করে কুড়িগ্রামের ‘মায়ের দোয়া’। এই বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকারকারী ‘মা-বাবার দোয়া’ পুরস্কার হিসেবে একটি ফ্রিজ পায়। ঘাসি নৌকার বিভাগে সিংগাইরের ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’ প্রথম হয়ে মোটরসাইকেল জিতে নেয় এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘কালাম শিকদার এক্সপ্রেস’ পায় একটি ফ্রিজ। পানসি নৌকা বিভাগে ‘জনতা এক্সপ্রেস’ চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোটরসাইকেল পায়, আর দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ স্থান অধিকারী ‘আজম ব্রাদার্স’, ‘বাগচী চ্যালেঞ্জার’ এবং ‘নকিব বাড়ি একতা এক্সপ্রেস’ প্রত্যেকে একটি করে ফ্রিজ লাভ করে। অন্যদিকে, ছান্দি নৌকা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয় হরিরামপুর উপজেলার কুশিয়ারচর এলাকার ‘গায়ান বাড়ি’, যারা পুরস্কার হিসেবে একটি ইলেকট্রিক মোটরবাইক পায়। এই বিভাগে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান পাওয়া ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, ‘গায়ান তরী’ এবং ‘সোনার চান’ প্রত্যেকে একটি করে ফ্রিজ লাভ করে। এ ছাড়াও ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের জন্য টেলিভিশন ও রাইস কুকারসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীর ব্যবস্থা ছিল।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ তা ম জহীর আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে। উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খানসহ অন্যান্য কমিটির সদস্যবৃন্দ। দর্শক হিসেবে আসা ঢাকা ও সাভারের বাসিন্দারা এই আয়োজনে নিজেদের অভিভূত বলে প্রকাশ করেছেন।