জাপানের সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় বহুদিনের। তবে অ্যানিমে, মাঙ্গা, কসপ্লে, জাপানি গেম ও পপ-কালচারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সেই আগ্রহ নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী জাপানি সাংস্কৃতিক উৎসব ‘নিহন যাই’। শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) শেষ হবে এ আয়োজন।
অ্যানিমের পর্দার প্রিয় চরিত্রগুলো বাস্তবের নগরীতে নেমে এলে দৃশ্যটা কেমন হবে—তারই যেন এক উত্তর মিলছে এই উৎসবে। ভেন্যুতে ঢুকতেই মন ভালো হয়ে যায় এমনই এক পরিবেশ। জেন-জি, জেন-আলফা, মিলেনিয়াল—নানা বয়সের জাপানি সংস্কৃতির অনুরাগীরা এসেছেন। কারও সাজে প্রিয় চরিত্রের ছাপ, কেউ পুরোপুরি কসপ্লে করে হাজির। অ্যানিমে চরিত্রের অ্যাকশন ফিগার, গেম খেলা, জাপানি খাবারের ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে তরুণদের পদচারণায় মুখর আয়োজন।
জাপান ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করার পাশাপাশি জাপানি সংস্কৃতি, বিনোদন ও সৃজনশীলতার নানা দিক তুলে ধরাই এই উৎসবের লক্ষ্য। ভেন্যুতে ঢুকলেই মনে হয়, অ্যানিমের চরিত্রগুলো যেন একে একে বাস্তবে চলে এসেছে। প্রতিটি লুক দেখে বোঝা যায়, প্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠার পেছনে ছিল যথেষ্ট প্রস্তুতি। কসপ্লে এই আয়োজনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশগুলোর একটি। ফ্রিরেন, ‘ঘোস্ট অব সুশিমা’, ডার্থ ভেডার, ‘দ্য প্রমিসড নেভারল্যান্ড’-এর এমা, ‘দ্য কিং অব ফাইটার্স’-এর লিওনা হেইডার্ন, ‘ওয়ান পিস’-এর লুফি, ড্রাগন বল জি-এর গোকু, ‘ডেমন স্লেয়ার’-এর ইনোসুকেসহ নানা জনপ্রিয় চরিত্রের সাজে দেখা গেছে তাঁদের। কারও সাজ ছিল চরিত্রের নিখুঁত অনুকরণ, কেউ নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে তুলে ধরেছেন নিজের মতো করে। দর্শনার্থীরাও প্রিয় চরিত্রের সাজে অংশ নিয়েছেন। কসপ্লে শুধু পোশাক পরা নয়, বরং পছন্দের একটি চরিত্রকে কিছু সময়ের জন্য নিজের করে নেওয়ার আনন্দ।
একক ও দলীয় কসপ্লের পাশাপাশি রয়েছে মাঙ্গা, ইলাস্ট্রেশন ও কারাওকে প্রতিযোগিতা। একক কসপ্লে বিচারকের দায়িত্বে বাংলাদেশের পপ-কালচার অঙ্গনের পরিচিত মুখেরা। চরিত্র কতটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সৃজনশীলতা, পরিবেশন এবং পুরো সাজের পেছনে শ্রম—সবকিছুই বিচার করা হচ্ছে। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে বসেছে অসংখ্য স্টল। অ্যাকশন ফিগার, কাতানা, কিরিংস, পোস্টার, বই, কিমোনো, অ্যানিমে প্রিন্টের টি-শার্ট—সবই আছে। ওয়ান স্টপ মার্চেন্ডাইজ, কিয়ান’স কালেকটিবলস, অতিবেগুনী, পুরিনস হেভেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসেছে। জাপানিজ চেইন বুকস্টোক কিনোকুনিয়া বাংলাদেশের বিশেষ স্টলও রয়েছে।
গেমিংপ্রেমীদের জন্য আছে পোকেমন গো, বেব্লেড ব্যাটল, শোগেন ক্ল্যাশ ও জেমস পিটের মতো গেম। কনসোল গেমিংয়ে চলছে ‘স্ট্রিট ফাইটার সিক্স’। জাপান দূতাবাসের আয়োজনে রয়েছে বিশেষভাবে নির্বাচিত জাপানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। মাঙ্গা, ইকেবানা ও অরিগামি নিয়ে কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। মাঙ্গা কর্মশালায় গল্প বলার কৌশল শেখানো হবে, ইকেবানায় ফুল সাজানোর শিল্প, আর অরিগামিতে কাগজ ভাঁজ করে শিল্পকর্ম তৈরির পদ্ধতি শেখাবেন দূতাবাসের সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞ কাজী বুশরা আহমেদ তিথি। কর্মশালাগুলোতে আলাদা ফি নেই, তবে উৎসবের বৈধ টিকিট ও নিবন্ধন প্রয়োজন।
খাবারের স্টলগুলোতেও ভিড় দেখা গেছে। চকলেট মোচি, মাচা মোচি, সুশি, রামেন, নিগিরিসহ নানা জাপানি খাবার রয়েছে। নতুন স্বাদ চেখে দেখতে আগ্রহী অনেকেই। জাপানি সংস্কৃতির জনপ্রিয়তার পেছনে অ্যানিমে ও মাঙ্গার বড় ভূমিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ছে সহজে। কোরিয়ান কে-পপ, ড্রামাসহ বিশ্বের নানা দেশের পপ-কালচারের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। সংস্কৃতির প্রভাব এখন পোশাক, সাজ, খাবার, গেমিং ও সৃজনশীলতার নানা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে।
‘নিহন যাই’-এর মতো আয়োজন সেই আগ্রহকে বাস্তবে নিয়ে আসছে। এখানে প্রিয় চরিত্রের মতো সাজা, মাঙ্গা নিয়ে কথা বলা, গেম খেলা কিংবা জাপানি খাবারের স্বাদ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সমমনা মানুষদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ক্যালিগ্রাফি, অরিগামি, ইকেবানা, কসপ্লে, কারাওকে ও মাঙ্গা কর্মশালা—সবই আছে। বিজয়ীদের পুরস্কারও ঘোষণা হবে। শেষ দিনেও আয়োজনে আসা যাবে। অনলাইনে বা সরাসরি নিবন্ধন করে উপভোগ করা যাবে। উৎসব চলছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।




