মানবপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বাণীকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিক আয়োজন। মধ্যযুগের সাধক কবীর এবং আধ্যাত্মিক মরমি ফকির লালন শাহর দর্শন, গান ও মানবিক চেতনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় শুরু হয় ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যৌথভাবে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ফজলুর রহমান স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যে স্বপ্ন ছিল তা হলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন — যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সবাই জাত-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে একসাথে সহাবস্থান করবে। তিনি বলেন, কবীর এবং লালন শাহর দর্শনের গভীরে খুঁজলে দেখা যায়, তাঁদের মতে মানুষের মাঝে কোনো জাতপাতের বিভেদ নেই। জীবনের জটিল সমস্যাগুলো বুঝতে হলে কবীরের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, অপরদিকে জীবনের গূঢ় রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য লালনের কাছে যেতে হবে। তাঁর মতে, দুই সাধকের মূল বাণী আসলে একই — আল্লাহ কিংবা ভগবান কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বাস করেন না; তিনি থাকেন প্রতিটি মানুষের অন্তরে, মন্দির-মসজিদে নয়।
এরপর বক্তব্য রাখেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব যখন নানা সংঘাত ও অস্থিরতায় বিপর্যস্ত, তখন কবীর ও লালনের দর্শন যেন একটি আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখাতে পারে। মানবজাতির ঐক্যের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, মহামারি করোনাভাইরাস কখনো কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষকে বেছে আক্রমণ করেনি; তার প্রতিষেধকও তৈরি হয়েছে সবার জন্য। এমনকি রক্ত পরীক্ষা করেও মানুষের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা করা সম্ভব নয় — এটাই প্রমাণ করে মানুষ মৌলিকভাবে অভিন্ন। লালনের বিখ্যাত বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের ভেতরে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিভেদ নেই। তিনি আরও বলেন, মানবতার এই প্রদীপ যেন চিরপ্রজ্বলিত থাকে; ঝড়-বৃষ্টি যতই আসুক না কেন, এই আলো যেন কখনো নিভে না যায়। বিভেদ সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে না পড়ে শান্তি ও মানবিকতার পথে সাহসের সাথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্য ও আলোচনা পর্ব শেষ হলে শুরু হয় প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এই পর্বে অংশ নেন কবীরপন্থী, রবিদাসপন্থী এবং নানকপন্থী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শিল্পীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এবং ‘কবীর-লালন মিউজিক্যাল মিশন’-এর শিল্পীরা। তাঁরা সম্মিলিতভাবে পরিবেশন করেন ভাবসংগীত ও আধ্যাত্মিক গান, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানের আয়োজক সংগঠন লালন বিশ্বসংঘ জানায়, আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীতে এই উৎসব চলবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গলেও অনুরূপ আয়োজন করা হবে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।




