খাদ্যে ভেজাল এবং কৃষিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার — এই দুই সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন ছবি ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’। চেতন ডি কে পরিচালিত এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় আছেন শ্রেয়স তলপড়ে। সাধারণত কমেডি চরিত্রে দর্শকদের হাসানোর কাজে ব্যস্ত থাকা এই অভিনেতা এবার দেখা দিয়েছেন অনেক বেশি গম্ভীর ও আবেগপ্রবণ একটি চরিত্রে। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের রেহেজা ক্লাবে প্রথম আলোর প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যের সঙ্গে আড্ডায় নিজের নতুন ছবি ও অভিনয়জীবনের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
ছবিটিতে কাজ করার পর থেকে খাবার নিয়ে তাঁর ভাবনায় এসেছে বড় পরিবর্তন। শ্রেয়স জানান, এখন খাবার সামনে এলেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে — এই খাবারটি কোথা থেকে এল, কতটা নিরাপদ? এমনকি দুধ খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি, আর পনির খাওয়াও কমিয়ে এনেছেন অনেকখানি। আসল আর ভেজালের মধ্যে পার্থক্য করা যে সত্যিই কঠিন, তা মেনে নিয়ে তিনি বলেন, ‘যতটা সম্ভব বিশ্বস্ত উৎস থেকে খাবার কেনার চেষ্টা করি।’
এই ছবির প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রথমেই তাঁর মনে হয়েছিল, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আরও আগেই সিনেমা তৈরি হওয়া উচিত ছিল। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে যে কাজ তাঁকে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করায়, সেটিই বেছে নেওয়া সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন তিনি। চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য তাকে যথেষ্ট গবেষণাও করতে হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির প্রশ্নে শ্রেয়সের মত, শুধু একটি সিনেমা নির্মাণ করলেই হবে না; দর্শকদেরও প্রশ্ন তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘অভিনয়শিল্পীরা কাজের মাধ্যমে একটি বক্তব্য সামনে রাখতে পারেন। তবে দর্শক কীভাবে সেটি গ্রহণ করবেন, সেটা তাঁদেরই সিদ্ধান্ত। সচেতনতা গড়ে তুলতে নিজের আগ্রহও দরকার মানুষের।’
ছবিতে এক কন্যাসন্তানের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রেয়স। বাস্তব জীবনেও তিনি একজন বাবা, তাই চরিত্রটি তাঁর কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল। অনেক দৃশ্যকে নিজের জীবনযাপনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন তিনি। কিছু দৃশ্য এতটাই আবেগঘন ছিল যে ডাবিংয়ের সময় নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। অভিনেতা জানান, ‘ডাবিং চলাকালীন কয়েকটি দৃশ্যে চোখে জল চলে এসেছিল। আবেগ এতটাই বেশি ছিল যে একদিন তো কাজই করা যায়নি, পরের দিন সেটি শেষ করতে হয়েছে।’
কমেডি ঘরানার জন্য দর্শকদের কাছে বেশি পরিচিত হলেও নিজেকে শুধু একটিমাত্র ধারায় আটকে রাখতে নারাজ শ্রেয়স। তাঁর মতে, প্রতিদিন একই ধরনের চরিত্রে কাজ করলে অভিনেতার মধ্যে একঘেয়েমি চলে আসে। নতুন চরিত্রের মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় বলে জানান তিনি।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কারণে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকসংখ্যা কমছে — এমন ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন এই অভিনেতা। তাঁর মতে, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার যে অভিজ্ঞতা, তা আলাদা। কোনো ছবিকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ‘ফোমো’ তৈরি হলে, অনেকেই অন্যের উৎসাহে প্রেক্ষাগৃহে ছুটে যান। ভারতের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মঙ্গলবার সস্তায় টিকিট পাওয়ার যে সুবিধা চালু হয়েছে, তাও দর্শক ফেরাতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।
ওটিটির এই বিস্তারকে নির্মাতা ও শিল্পীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবেই দেখছেন শ্রেয়স। তিনি বলেন, ‘প্রেক্ষাগৃহ ও টেলিভিশনের বাইরে মুঠোফোনের মাধ্যমেও এখন দর্শকের কাছে গল্প পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। নতুন বিষয় ও ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা ওটিটিতে অনেক বেশি।’ তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও জরুরি। গল্পের প্রয়োজন না থাকলে অকারণে গালিগালাজ বা অস্বস্তিকর দৃশ্য রাখা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। ‘আমি নিজের ছবি মা-বাবা এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে দেখতে ভালোবাসি। চাই না তাঁরা ছবি দেখতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়ুন। মেয়েকে নিয়ে ওটিটিতে কিছু দেখার সময়ও ভয় হয় — কখন গালিগালাজ বা অস্বস্তিকর দৃশ্য চলে আসে। সত্যি বলতে, পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে দেখতে পারেন এমন কাজের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে,’ বলেন শ্রেয়স।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও সমান আগ্রহ তাঁর। প্রযোজক হিসেবে গল্প নির্বাচন, শিল্পী বাছাই, শুটিং ও পোস্ট-প্রোডাকশন, এমনকি মুক্তির পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নতুন করে পরিচালনায় ফেরার পরিকল্পনা আছে কি না — এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘হতে পারে, আগামী বছর।’
পরিচালক চেতন ডি কে-র সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে শ্রেয়স বলেন, পরিচালকের অভিজ্ঞতার চেয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‘গল্প বলার সময়ই বোঝা যায় পরিচালক বিষয়টি কতটা বিশ্বাস করেন। ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’র গল্প ও চরিত্র আমাকে সত্যিই টেনেছিল। প্রথম ছবি হওয়ায় চেতন শক্তিশালী একটি দল গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছিলেন। সবাই নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’ ভবিষ্যতে প্রযোজক হিসেবে সামাজিক বিষয় নিয়ে ছবি করতে চান শ্রেয়স, তবে শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী গল্প। তিনি বলেন, ‘বিষয় ও গল্পের সুন্দর সমন্বয় ঘটলে অবশ্যই এমন ছবি প্রযোজনা করতে চাই।’ ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’ নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা — দর্শক ছবিটি শুধু দেখবেন না; নিজেদের খাবার ও জীবনযাপন নিয়েও নতুন করে ভাববেন।




