শৈশব থেকেই ছেলেদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় যে, কান্না দুর্বলতার লক্ষণ এবং পুরুষ মানুষকে সব পরিস্থিতিতেই শক্ত থাকতে হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত এই ধারণাটি পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। খেলতে গিয়ে চোট পাওয়া বা প্রিয় কিছু হারানোর মতো সাধারণ ঘটনাতেও ছেলেদের কান্না চেপে রাখতে বলা হয়, যা বড় হওয়ার সাথে সাথে এক ধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ৩০ বছর বয়সী আরিফ (ছদ্মনাম) নামক এক বেসরকারি ఉద్యোগীর কথা বলা যায়, যিনি কর্মক্ষেত্রে প্রচণ্ড চাপ এবং পারিবারিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও প্রিয়জনদের সামনে কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। তাঁর ভয়, কাঁদলে অন্যরা তাঁকে দুর্বল মনে করবেন। মূলত দৃঢ়তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কান্না না করার যে ভ্রান্ত সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে, সেটিই পুরুষদের আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতে বাধা দেয়।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) তথ্য অনুযায়ী, নারীদের তুলনায় পুরুষদের কান্নার হার অনেক কম। যেখানে নারীরা বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৬৪ বার কাঁদেন, সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা মাত্র ৫ থেকে ১৭ বার। তবে গবেষকদের মতে, এই পার্থক্যের পেছনে কেবল জৈবিক কারণ নয়, বরং সামাজিক পরিবেশ এবং ছোটবেলার শিক্ষা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়ার ৮৯৩ জনের ওপর করা এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রচলিত 'পুরুষালি' মূল্যবোধে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তাদের মধ্যে কান্নার প্রবণতা সবচেয়ে কম। অন্যদিকে, যারা নারীত্বের সাথে যুক্ত আবেগ প্রকাশের ধরনগুলোকে সহজভাবে গ্রহণ করেন, তারা কান্নাকে মানসিক প্রশান্তির উপায় হিসেবে দেখেন এবং বেশি কাঁদেন।

কান্নার পর মন হালকা হওয়া বা স্বস্তি পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক আচরণের ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার সময় যদি কেউ সহানুভূতি, প্রয়োজনীয় তথ্য বা শারীরিক সান্ত্বনা পান, তবে তাঁর মানসিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন চরম সংকটে থাকেন, তখন তিনি পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার কথা ভেবে নিজের কষ্ট আড়াল করেন। এমন সময়ে সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি তাঁর অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ এবং পরিবারের সদস্যদের সমর্থন তাঁকে প্রকৃত মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।

তবে মজার বিষয় হলো, সব ক্ষেত্রে পুরুষের কান্না সমাজ একইভাবে দেখে না। খেলাধুলার মাঠের আবেগঘন মুহূর্তে পুরুষ খেলোয়াড়দের কান্না দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল বা ক্রিকেটের বড় ম্যাচে জয়-পরাজয়ের মুহূর্তে চোখের পানিকে পরিশ্রম বা দলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। গবেষকদের মতে, যাদের সামাজিক মর্যাদা বা আদর্শগত অবস্থান দৃঢ়, তাদের কান্নার ক্ষেত্রে সমাজ বেশি ছাড় দেয়। অর্থাৎ, কে কাঁদছেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কাঁদছেন, তার ওপর ভিত্তি করে কান্নার মূল্যায়ন পরিবর্তিত হয়।

পরিশেষে, শক্ত থাকার অর্থ এই নয় যে আবেগহীন হতে হবে। দায়িত্ব পালন এবং সংকটে দৃঢ় থাকা প্রশংসনীয়, কিন্তু তা যেন অনুভূতি চেপে রাখার কারণ না হয়। শোক প্রকাশের ধরন একেকজনের একেক রকম হতে পারে; কেউ কাঁদতে পারেন, আবার কেউ নীরব হয়ে যেতে পারেন। কান্নার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে কারও কষ্টের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কান্না মানুষের একটি স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়া, তাই পুরুষের ক্ষেত্রেও একে দুর্বলতা না ভেবে সহমর্মিতার সাথে দেখা জরুরি।