কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ ও নানা ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটানোর পরও দক্ষিণ কোরিয়ার নামকরা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখনও সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিগ্রির গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সিউলের বড় কর্পোরেশনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি তৈরি করছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরির নিশ্চয়তা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাঙ্গনে এখন নতুন ধরনের একটি ধারা দেখা যাচ্ছে — কর্পোরেট অর্থায়নে পরিচালিত 'কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্ট'। এসব বিভাগে কোম্পানিগুলো সরাসরি কোর্স তৈরিতে সহায়তা করে, আর্থিক সহায়তা দেয় এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পথ সুগম করে। এরই ধারাবাহিকতায় সোগাং ইউনিভার্সিটির 'সিস্টেম সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং' বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জং চায়ে-রিন। মেমোরি চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে চার বছরের এই কোর্স শেষ করলেই তার চাকরি নিশ্চিত। অন্যদিকে, সাংইয়ংকিউভয়ান ইউনিভার্সিটির ইন্টেলিজেন্ট সফটওয়্যার বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কিম তাই-রিন স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সহযোগিতায় তৈরি পাঁচ বছরের ব্যাচেলর্স-মাস্টার্স প্রোগ্রামে পড়ছেন। সেখানে চাকরির সুযোগ অনেকটাই নিশ্চিত, তবে তাকে স্যামসাংয়ের আলাদা একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানই নয় — কোরিয়া ইউনিভার্সিটি, হানইয়াং ইউনিভার্সিটি, ইয়োনসি ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, উলসান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি — একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অংশীদারিত্ব আছে এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের। হুন্দাই মোটর, এলজি ইউপ্লাসের মতো গাড়ি নির্মাতা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর কোম্পানিগুলোর সাথেও চুক্তিভিত্তিক বিভাগ চালু আছে। সিউলভিত্তিক জংরো একাডেমির তথ্য বলছে, এসব কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্টে আবেদনকারীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে স্যামসাংয়ের প্রতিটি আসনের বিপরীতে লড়ছেন ১৩.৪৪ জন, আর এসকে হাইনিক্সের কোর্সগুলোতে ৯.১৪ জন করে শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য এসব প্রোগ্রামের আকর্ষণ শুধু চাকরির নিশ্চয়তাই নয়, আর্থিক সুবিধাও অনেক। সোগাং ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জং জানান, টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ওয়ান পড়াশোনার ভাতা পাচ্ছেন। ভালো ফলাফল ও প্রজেক্টের জন্য অতিরিক্ত বৃত্তিরও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শর্তও আছে — স্কলারশিপ ধরে রাখতে ন্যূনতম ২.৩ জিপিএ এবং এসকে হাইনিক্সে চাকরি নিশ্চিত করতে ২.৭ জিপিএ বজায় রাখতে হয়। কোর্স মাঝপথে ছেড়ে দিলে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তা ফেরত দিতে হয়। এসকে হাইনিক্স জানিয়েছে, গ্র্যাজুয়েটদের আর্থিক সহায়তার মেয়াদের সমান সময় কোম্পানিতে কাজ করতে হবে, তবে তারা নিয়মিত গ্র্যাজুয়েটদের মতোই সমান পদমর্যাদা ও মূল বেতন পাবেন।
স্যামসাংয়ের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। এসকেইউ প্রোগ্রামে প্রথম তিন বছর নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে টিউশন ফি মওকুফ করা হয়। শিক্ষার্থী কিম বলেন, তৃতীয় বর্ষের শেষ দিক থেকে স্যামসাংয়ের আলাদা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া যায়। এটি একটি 'ন্যূনতম প্রক্রিয়া', যেটি সফলভাবে সম্পন্ন করলে পাঁচ বছর মেয়াদি কোর্সের বাকি সময় পূর্ণ টিউশন ফি সহায়তা পান। কোর্সটি ২০২৪ সালে শুরু হওয়ায় প্রথম ব্যাচ এখনও গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেনি।
শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয় এসব অংশীদারিত্ব। স্যামসাং এসকেইউ স্কলারদের জন্য ইন্টার্নশিপ, বিদেশি গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন। গত বছর জং এসকে হাইনিক্সের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন এবং সেখানে আয়োজিত ফোরামে অংশ নেন। তিনি বলেন, প্রথম বর্ষের একটি ক্লাসে প্রতি সপ্তাহে এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা এসে তাদের দায়িত্বের প্রযুক্তি বা ব্যবসা নিয়ে লেকচার দিতেন। এতে তিনি সরাসরি এসকে হাইনিক্সের নির্বাহীদের কাছে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করতে পেরেছিলেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও পেয়েছিলেন।
কারিকুলাম ডিজাইনেও কোম্পানিগুলোর ভূমিকা আছে। এসকে হাইনিক্স জানিয়েছে, তারা কারিকুলাম ডিজাইন ও পর্যালোচনায় আংশিকভাবে অংশ নেয়, তবে আনুষ্ঠানিক ইন্টার্নশিপ বা হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার সুযোগ এখন নেই — ভবিষ্যতে চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। স্যামসাং বলেছে, তারা প্রাসঙ্গিক কোর্স ও কারিকুলামের বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে মতামত দেয়, তবে কর্মীদের সরাসরি কোর্স পরিচালনার পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। শিক্ষার্থী জং জানান, এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা সেমিনার ও বিশেষ লেকচারের জন্য ক্যাম্পাসে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কোর্স পরিচালনা করেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ জায়ান্টদের জন্য এখন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর নয়, বরং 'কন্ট্রাক্ট ডিপার্টমেন্ট'-এর মাধ্যমেই শীর্ষ প্রতিভা ও দক্ষ কর্মী তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।




