প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ব্যাপক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি। এক সময় ব্যাংকিং সেবার জন্য নির্দিষ্ট শাখায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, যা বিশেষ করে গ্রাম ও চরাঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল যাত্রা করা ব্যাংকটি বর্তমানে উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির এক সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

ব্যাংকটির বর্তমান অবকাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তাদের শাখা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৯টি এবং উপশাখার সংখ্যা ৪০০টিতে পৌঁছেছে। এছাড়া ৬২৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৮৭টি এটিএম ও সিআরএম বুথ চালু রয়েছে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে যুক্ত মানুষগুলো এখন সহজেই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আসতে পারছে। ২০১৯ সালে উপশাখা চালুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে এনআরবিসি ব্যাংক বিশেষ নজর দিয়েছে। ২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘এনআরবিসি প্লানেট’ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই হিসাব খোলা, ফান্ড ট্রান্সফার এবং মোবাইল রিচার্জের মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন। ক্যাশলেস বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যাংকটি ২০۲۰ সালে প্রথমবার চেক বা কার্ড ছাড়াই কিউআর কোড স্ক্যান করে শাখা থেকে টাকা তোলার সুবিধা প্রবর্তন করে। বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনা হয়েছে, যার ফলে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মার্চেন্ট সংখ্যা ২১ হাজারে উন্নীত হয়েছে। ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম খান উল্লেখ করেছেন যে, প্রযুক্তির এই ব্যবহার পরিশোধব্যবস্থাকে সহজ করার পাশাপাশি ব্যাংকের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে আরও শক্তিশালী করবে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করেছে এনআরবিসি ব্যাংক। আবেদন থেকে শুরু করে ঋণ বিতরণ পর্যন্ত পুরো কার্যক্রমটি এখন ডিজিটাল লোন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ব্যাংকটির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ উদ্যোক্তাকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে, যার মোট স্থিতি ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণের ৩২ শতাংশই সিএমএসএমই খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া নারী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘প্রবাস বন্ধু’ ঋণ প্রকল্প চালু রয়েছে। ব্যাংকের চিফ বিজনেস অফিসার মো. শাহীন হাওলাদার জানান, তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও গ্রাহককেন্দ্রিক এসএমই এবং রিটেইল প্রডাক্টের কারণেই স্বল্প সময়ে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাকে যুক্ত করে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

আর্থিক সেবার পাশাপাশি সরকারি সেবা পৌঁছে দিতেও কাজ করছে এই ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের অটোমেটেড চালান সিস্টেম ব্যবহার করে তারা শাখা ও এজেন্ট পয়েন্টের মাধ্যমে ৬৪৫ ধরনের সরকারি ফি, রাজস্ব এবং ইউটিলিটি বিল সংগ্রহ করছে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় টেকসই অর্থায়ন ও গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে; ২০২৬ সালের জুন শেষে তাদের মোট আমানত ২০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ১৫ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।