দীর্ঘদিন ধরে পানীয় হিসেবে এই অঞ্চলে চায়ের যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠা চায়ের জায়গাটি এখন দখল করে নিচ্ছে কফি। বর্তমান সময়ে সামাজিক আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা অফিসের প্যান্ট্রিতে কফি হয়ে উঠেছে এক অপরিহার্য বিকল্প। মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের এই ধারাটি আমদানির পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে কফি আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩৯ টন, যা ২০১২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৪ টনে। তবে ২০২৫ সালে এই অংকটি লাফিয়ে পৌঁছেছে ১ হাজার ৭৪৫ টনে। ২০১২ সালের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, গত ১৩ বছরে কফি আমদানি বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি। ডিএই-র এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দশ বছরে চায়ের বাজার যখন গড়ে বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন কফির বাজার বেড়েছে গড়ে ৫৬ শতাংশ হারে। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে কফি বিনের দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং আমদানি শুল্ক বাড়ার কারণে আমদানির পরিমাণ ১৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪৩৯ টনে নেমেছিল, তবে উদ্যোক্তারা একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন কারণ দেশীয় উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ থেকে বাংলাদেশে কফি আমদানি করা হয়, যার ৮৮ শতাংশ আসে ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কফি আসে ব্রাজিল থেকে। বাজারের এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে নেসলে আনুষ্ঠানিকভাবে কফি বাজারজাত করার মাধ্যমে। ২০০৩ সালে ইনস্ট্যান্ট কফির বাজারের ৬৭ শতাংশই ছিল নেসলের দখলে। পরবর্তীতে বাজারে বৈচিত্র্য আসে এবং নর্থ এন্ড, গ্লোরিয়া জিনস, ক্রিমসন কাপ, বারিস্তা, বাতেল ও সেগাফ্রেডোর মতো আউটলেটগুলো বিপুল বিনিয়োগ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে। বর্তমানে নেসলের পাশাপাশি আবুল খায়ের, প্রাণ-আরএফএল, বেক্সিমকো ও মেঘনা গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীসহ প্রায় ২৫০টির বেশি কোম্পানি কফি আমদানি ও বাজারজাত করছে। পাশাপাশি ম্যাককফি, কফিকো এবং তোরাবিকার মতো ব্র্যান্ডগুলোও বাজারে সক্রিয়।
আমদানির পাশাপাশি এখন দেশীয় কফি উৎপাদনের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য তিন জেলার পাশাপাশি এখন টাঙ্গাইল, রংপুর ও নীলফামারীতেও বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ হচ্ছে। বাজারের অনুকূল পরিবেশ দেখে কৃষকরা এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে এগিয়ে এসেছে; যেমন আবুল খায়ের গ্রুপ পার্বত্য অঞ্চলে কফি চাষ করছে এবং নর্থ এন্ড প্রায় এক দশক ধরে পাহাড়ের কৃষকদের সহায়তা করে ‘হিল ট্র্যাক্ট ব্র্যান্ড’ নামে কফি বাজারজাত করছে।
এই উদীয়মান খাতটিকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এবং কাপনা টি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরান তানভিরুর রহমান। তাঁর মতে, দেশীয় উৎপাদকদের উৎসাহিত করতে আমদানিতে শুল্ক কমানোর পরিবর্তে তা বাড়িয়ে রাখা উচিত। বর্তমানে প্যাকেটজাত কফির আমদানিতে শুল্ক ৯৬.১ শতাংশ এবং বাল্ক আমদানিতে ৬৪.২৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে উৎসাহিত করতে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই শুল্ক সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।




