পাবনার চাটমোহর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী অমৃতকুণ্ডা হাট বা রেলবাজার হাট বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রাণবন্ত গ্রামীণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ১৯১৫-১৬ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ ব্রডগেজ রেললাইন স্থাপনের পর স্টেশনকেন্দ্রিক এই বাজারের সূচনা হয়। কালক্রমে স্থানীয় অমৃতকুণ্ডা হাটের সঙ্গে একীভূত হয়ে এটি বর্তমানের বিশাল রূপ লাভ করেছে। প্রতি রোববার এখানে প্রায় ৫০০ জন ব্যবসায়ীর অস্থায়ী দোকান বসে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হাটের বার্ষিক ইজারা থেকে আয় করা হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ভোরের হিমেল হাওয়ায় শুরু হয় হাটের কর্মচঞ্চলতা। সূর্য ওঠার আগেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। একদিকে ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেলের শব্দ, অন্যদিকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর-কষাকষির কোলাহলের এক অনন্য মিশেল দেখা যায় এখানে। হাটে আসা কৃষকদের ভ্যানে করে আনা হয় বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট। রাস্তার ধারে সাজানো থাকে ধানের চারা এবং তাজা আখ। বিশেষ করে গবাদিপশুর বাজারটি এই হাটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এখানে দেশি জাতের গাভি, ষাঁড় ও কালো মহিষের বড় সংগ্রহ থাকে, যা চলনবিল অঞ্চলের খামারি ও কৃষিজীবীদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও এই হাটের বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। বস্তাবন্দি জিরা, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলা, ডাল ও শস্যদানার পাশাপাশি পাওয়া যায় তাজা দেশীয় মাছ যেমন পুঁটি ও কাচকি। প্রবীণ ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ, যিনি একাত্তর সালের আগে থেকেই এখানে মিষ্টি বিক্রি করছেন, জানান দীর্ঘ সময়ে এই হাটের অনেক পরিবর্তন তিনি দেখেছেন। একইভাবে লবণ বিক্রেতা মো. আনিস জানান, তাঁর পূর্বপুরুষরাও এখানে লবণ বিক্রি করতেন। এক সময় পালতোলা নৌকায় করে দক্ষিণাঞ্চল থেকে বস্তাবন্দি লালচে মোটা লবণ আসত এখানে, যা এখন কোম্পানির প্যাকেটে রূপান্তরিত হয়েছে।
হাটের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে কাঠের আসবাবপত্রের বাজার। এখানে অভিজ্ঞ কারিগররা তৈরি করেন টেবিল, চেয়ার, আলমারি ও খাট। এমনকি পশুপাখির জন্য বিশেষ কাঠের ঘরও এখানে সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। কারিগর বিশ্বনাথ মুরারি গত ৪৫ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, মানুষের রুচির পরিবর্তন হলেও এই হাটের ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে।
চলনবিলে বর্ষার পানি নামলে এই হাটে এক ভিন্ন রূপ দেখা যায়। তখন বাঁশ ও পাটের সুতলি দিয়ে তৈরি খলসুনি, ধুন্দি ও খাদুনের মতো মাছ ধরার সরঞ্জামের ব্যাপক বাজার বসে। কারিগর নিমাই দাসের মতো অনেকেই পৈতৃক পেশা হিসেবে এই কুটিরশিল্প বাঁচিয়ে রেখেছেন, যদিও বর্তমান বাজারে উপকরণের উচ্চমূল্যের কারণে লাভ খুবই সামান্য। এছাড়া সুতার জালের ব্যবসায়ী সাহেদ সরদারের মতে, বর্তমানে ক্রেতারা বাঁশের ফাঁদের চেয়ে টেকসই জালের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
বাণিজ্যিক পণ্যের পাশাপাশি এখানে খাদ্য ও পোশাকের বাজারও বেশ জমজমাট। তাজা জিলাপি, মুড়কি ও নিমকির দোকানের পাশাপাশি দেশি মাছের ঝোল ও ডিমের তরকারির হোটেলগুলো ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। কাপড় বাজারে থান কাপড়, শাড়ি ও লুঙ্গির পাশাপাশি পাওয়া যায় স্যান্ডেল-জুতা এবং প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে তালপাতার রঙিন হাতপাখাও বিক্রি হয়। ভিড় থাকলেও বর্তমান সময়ের বেচাকেনা আগের মতো রমরমা নয় বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।




