শহরের কোলাহলে মেশিনের অবিরাম শব্দের মধ্য দিয়েই জীবন অতিবাহিত করছেন সোহেদা বেগম। ২০০১ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের জীবনযুদ্ধের গল্প তাঁর, যার শুরু হয়েছিল অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে। ২০০৫ সালের মার্চ মাসে রাজধানীর রামপুরার ডিআইটি রোডে অবস্থিত সোলার গার্মেন্টস (প্রা.) লিমিটেডে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন তিনি। শুরুতে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি এখন ওই কারখানার একজন সিনিয়র অপারেটর। শুধু তাই নয়, ২০১৮ সাল থেকে তিনি দুই দফায় নির্বাচিত হয়ে কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
সোহেদার বর্তমান বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা, তবে ওভারটাইম করলে তা ২৫-২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। শুরুর দিকে তাঁর বেতন ছিল মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকা। পড়াশোনার সুযোগ না থাকায় শুরুতে কারখানার কারিগরি শব্দগুলো বুঝতে তাঁর কষ্ট হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে বিদেশি ক্রেতারা কারখানায় এলে তাঁদের সাথে কথা বলেন তিনি। এই পরিবর্তন তাঁকে আত্মতৃপ্তি দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে জীবনে তিনি কিছু অর্জন করতে পেরেছেন।
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সোহেদার অবদান অনস্বীকার্য। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন সুপারভাইজারদের অশোভন আচরণের কষ্ট। একসময় বড় ছেলের জন্মের সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি না পেয়ে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। সেই কষ্ট থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি ইউনিয়ন সভাপতি হিসেবে কারখানায় চার মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করেছেন। এছাড়া নারীদের জন্য আলাদা শৌচাগার নিশ্চিত করা এবং শৌচাগারে যাওয়ার জন্য আগেকার কার্ড সিস্টেম বাতিল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন তিনি। এখন কারখানার ছুটি সময়মতো বিকেল ৫টায় দেওয়া হয়, যা আগে রাত ১০টা পর্যন্ত গড়াত।
ব্যক্তিগত জীবন এবং সংসারিক সংগ্রামের চিত্রটি বেশ করুণ। পশ্চিম রামপুরার একটি ভবনের নিচতলার এক ছোট ঘরে সোহেদার সংসার। সেখানে তাঁর সাথে থাকেন স্বামী মো. শাহীন মুন্সি, দুই ছেলে, এবং মা শাহিদা বেগম। স্বামী শাহীনও একই কারখানায় কাজ করে বর্তমানে অন্য একটি কারখানায় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত, যার মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা। এই ছোট ঘরে খাট, ফ্রিজ, টেলিভিশন ও আলমারির ভিড়ে 다섯জন সদস্যকে মানিয়ে নিতে হয়। রান্নাঘর ও শৌচাগার অন্য দুটি পরিবারের সাথে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয় তাঁদের।
আয় দুটি হলেও সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। ৯ হাজার টাকা ঘর ভাড়া, ১০ হাজার টাকার বেশি খাবার খরচ এবং বরিশালে শাশুড়ির জন্য টাকা পাঠানোর পর সঞ্চয়ের সুযোগ থাকে না। উল্টো প্রায় ২০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে তাঁদের ওপর। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় কাঁদানে গ্যাসের কারণে শাহীনের চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয়, যার চিকিৎসায় প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া সোহেদা ও তাঁর মায়ের দীর্ঘমেয়াদী ওষুধের খরচ এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এত অভাবের মাঝেও সোহেদার চোখে দুটি স্বপ্ন উজ্জ্বল। একটি হলো বরিশালে নিজের জন্য একটি ছোট বাড়ি তৈরি করা, আর অন্যটি হলো বড় ছেলে সিয়ামের পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পাওয়া। তবে পারিবারিক জীবনে সুখের জায়গাটি হলো পারস্পরিক সম্মান। সোহেদা তাঁর বেতনের টাকার ওপর পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন, যা তাঁকে কারখানায় নেতৃত্ব দিতে সাহস জোগায়। তাঁর স্বামী শাহীনও স্ত্রীর এই অবদান স্বীকার করেন এবং মনে করেন সোহেদার কারণেই এই শহরে তাঁরা টিকে থাকতে পেরেছেন।




