সাধারণ চলাফেরার জন্য প্লাস্টিকের স্যান্ডেল বা চটি বহু মানুষের কাছে সস্তা ও আরামদায়ক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার যে শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তা অনেকেই জানেন না। সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে, এই স্যান্ডেলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নানা রাসায়নিক উপাদান কেবল পায়ের স্বাস্থ্যই নয়, পুরো শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরার ফলে প্রজননক্ষমতা হ্রাস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের আশঙ্কা তৈরি হয়।
পায়ের উপর সরাসরি প্রভাবের কথা বলতে গেলে, প্লাস্টিকের স্যান্ডেলে সাধারণত আর্চ সাপোর্ট ও কুশনিং থাকে না। ফলে পায়ের তলায় অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা থেকে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস বা গোড়ালির তীব্র ব্যথা, হিল পেইন, পায়ের তলায় জ্বালাপোড়া এমনকি ঘাড়, কোমর ও হাঁটুর সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বাতাস চলাচলের অভাবে পা ঘামে এবং আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়, যার ফলে ফাঙ্গাস ইনফেকশন, অ্যাথলিটসফুট, দুর্গন্ধ এবং ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঘর্ষণের কারণে ফোসকা, চামড়া ফাটা এবং পিছলে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের প্রতি অ্যালার্জি থাকায় ত্বকে লালভাব, চুলকানি এবং তীব্র জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা যায়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো প্লাস্টিকের স্যান্ডেলে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ। সস্তা পিভিসি বা ভিনাইল দিয়ে তৈরি এসব স্যান্ডেলে ফ্যালেটস (যেমন DEHP, DBP, DiNP), বিসফেনল-এ (BPA) এবং কখনো কখনো সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুও মিশে থাকে। ফ্যালেটস মূলত প্লাস্টিককে নরম ও নমনীয় করতে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এগুলো এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর হিসেবে কাজ করে। পায়ের ত্বক, বিশেষ করে তলা অত্যন্ত শোষণক্ষম হওয়ায় ঘামের সঙ্গে এসব রাসায়নিক সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, গরম ও ঘামের কারণে ফ্যালেটস স্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে ত্বকে শোষিত হয়।
এসব রাসায়নিকের প্রভাবে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া, শুক্রাশয়ের সমস্যা, নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের অবনতি এবং গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ডিইএইচপি আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার তালিকায় সম্ভাব্য কার্সিনোজেন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিবিপি শিশুদের ব্রেন ডেভেলপমেন্টে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে এডিএইচডি বা লার্নিং ডিজঅর্ডারের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, থাইরয়েড সমস্যা এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর লক্ষাধিক মৃত্যুর সঙ্গে ফ্যালেটসের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
শিশু, গর্ভবতী নারী এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাদের শরীরে রাসায়নিকের প্রভাব দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে স্থানীয় বা চায়নিজ পণ্যে নিয়ন্ত্রণ কম থাকায় অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত ফ্যালেটস পাওয়া যায়। কিছু পরীক্ষায় স্যান্ডেলে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ডিইএইচপি বা ডিবিপির উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল সম্পূর্ণ বর্জন করতেই হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝেমধ্যে ব্যবহার করলে তেমন ক্ষতি নেই, কিন্তু প্রতিদিনের জুতা হিসেবে এটি একদমই উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে গরমকালে যখন ঘাম বেশি হয়, তখন ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় খালি পায়ে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকি কমাতে কী করণীয়? প্রথমত, পিভিসি লেবেলযুক্ত (যে প্লাস্টিকের নিচে #3 চিহ্ন থাকে) স্যান্ডেল এড়িয়ে চলুন। বেছে নিন EVA ফোম, রাবার, চামড়া বা ‘ফ্যালেট-ফ্রি’ লেবেলযুক্ত পণ্য। শিশু ও গর্ভবতীদের জন্য প্লাস্টিকের স্যান্ডেল না পরানোই ভালো। পা ঘামলে ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন এবং সম্ভব হলে মোজা পরুন। যদি পায়ে লালভাব, চুলকানি বা অস্বস্তি দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চর্মরোগ বা অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য চামড়া, ক্যানভাস বা ভালো কুশনযুক্ত রাবারের স্যান্ডেল বেছে নেওয়াই উত্তম। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল শুধু বাথরুম, সমুদ্রসৈকত বা অল্প সময়ের জন্য ব্যবহারে সীমাবদ্ধ রাখুন।
সবশেষে, সস্তা বলে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ব্যবহারের প্রতি আকর্ষণ যতই থাকুক, এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কথা ভাবলে চামড়ার স্যান্ডেলও আর সস্তা মনে হবে না। নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।




