রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারের ফুটপাতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। পেশায় চর্মকার অনন্ত চন্দ্র দাস (৪১) জুতা পালিশের কাজের অবসর সময়ে নিয়মিত পত্রিকা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই অভ্যাসের কারণেই তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে ভবানীগঞ্জ উপজেলা সড়কের পাশে তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের ফাঁকে তিনি নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন এবং বিশেষ কোনো প্রতিবেদন পছন্দ হলে তা পরে পড়ার জন্য আলাদা করে রাখেন।

২০০৩ সাল থেকে অনন্ত নিয়মিত পত্রিকা কেনা শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে ওই এলাকায় চরমপন্থীদের সক্রিয়তা ও খুনের ঘটনার বিস্তারিত জানতে স্থানীয় দুই টাকা দামের পত্রিকা পড়ার আগ্রহ থেকে এই অভ্যাস গড়ে ওঠে। বর্তমানেও প্রতিদিন সকালে দোকানে পৌঁছেই হকারের কাছ থেকে তিনি পত্রিকা সংগ্রহ করেন। কাজের চাপ কম থাকলে প্রয়োজনীয় খবরগুলো পড়ে নেন এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় পত্রিকাটিকে ব্যাগে করে নিয়ে যান, যাতে কেউ তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা না করে। অনন্তের ভাষায়, পত্রিকা পড়া এখন তাঁর নেশা ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা ছাড়া তিনি স্বস্তি পান না। তাঁর মতে, জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পেশার প্রয়োজন নেই, কেবল আগ্রহ থাকলেই চলে।

করোনা মহামারির সময়ে ব্যবসা মন্দা হওয়া এবং সংবাদপত্র সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তিনি চরম সংকটের মুখে পড়েন। তবে নিজের পেশাকে তিনি কখনোই ছোট করে দেখেননি। বরং দোকানে পত্রিকা রাখলে খদ্দেরদের দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা যায় বলে তিনি মনে করেন। জুতা পালিশ করার সময় খদ্দেরদের পত্রিকা দিয়ে তিনি তাঁদের সময় কাটাতে সাহায্য করেন, যার ফলে নিজের পড়ার পাশাপাশি অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দেন।

পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে বাপ-দাদার পেশাতেই রয়ে গেছেন অনন্ত, যদিও চতুর্থ শ্রেণির পর তাঁর পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করেন তিনি, যার মধ্য থেকে প্রতি মাসে ১০০ টাকা পত্রিকা কেনার জন্য আলাদা করে রাখেন। তাঁর এই আগ্রহের কথা জানান স্থানীয় পত্রিকা বিক্রেতা সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু। তিনি জানান, পত্রিকা পৌঁছাতে দেরি হলে অনন্ত নিজেই দোকানে এসে তা সংগ্রহ করেন। একইসাথে ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রেজাউনাল করিম দীর্ঘকাল ধরে রাস্তার ধারে অনন্তর এই পড়ার অভ্যাস দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানান।

বর্তমানে অন্যের জায়গায় একটি কুঁড়েঘরে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন অনন্ত। তাঁর একমাত্র আকুতি হলো মাথা গোঁজার নিজস্ব একটি জায়গা। সরকারিভাবে ঘরের জন্য আবেদন করলেও তিনি তা পাননি। গণিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুস সোবহান মণ্ডল জানান, অনন্ত তাঁর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং উপজেলা প্রশাসন চাইলে তাঁকে আবাসন বিষয়ে সহায়তা করতে পারে।