খাবারকে ভালো রাখতে বাজারের সবজি, কাঁচা মাংস কিংবা রান্না করা পদ এখন প্রায় সবখানেই প্লাস্টিক প্যাকেটে মুড়ে রাখা হয়। জীবাণু ও বাতাস থেকে খাবারকে কিছুটা সুরক্ষা দেয় এই মোড়ক, পাশাপাশি পানিও শুকিয়ে যেতে দেয় না। তবে প্রশ্ন হলো, এই প্লাস্টিক কি খাবারের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে এটি সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে থাকলে কিংবা উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান খাবারে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সব প্লাস্টিক সমান বিপজ্জনক নয়। তাপের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে প্লাস্টিককে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—থার্মোপ্লাস্টিক ও থার্মোসেট। থার্মোপ্লাস্টিক গরমে গলে গিয়ে ঠান্ডায় শক্ত হয় এবং বারবার নতুন রূপ দেওয়া যায়। অন্যদিকে থার্মোসেট একবার উত্তপ্ত হলে স্থায়ী রূপ নেয়, যা অত্যন্ত শক্ত ও তাপপ্রতিরোধী। খাবার মোড়ানোর কাজে থার্মোপ্লাস্টিকই বেশি ব্যবহৃত হয়। আগে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) জনপ্রিয় ছিল, তবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় এখন অন্য পলিমার ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন বা এলডিপিই (৪ নম্বর শ্রেণির প্লাস্টিক) খাবার মোড়কে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি হালকা, নমনীয় এবং বাতাস-জীবাণুর প্রবেশ রোধে কার্যকর। ফলে খাবার দ্রুত শুকায় না, পানি বেরিয়ে যায় না। প্লাস্টিক ও খাবারের মধ্যে সব সময় কোনো না কোনো আদান-প্রদান ঘটে, যা বিজ্ঞানীরা মূলত তিন প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যা করেন—শোষণ, মাইগ্রেশন ও পারমিয়েশন। শোষণ প্রক্রিয়ায় খাবারের উপাদান, যেমন পানি বা চর্বি, প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চর্বিযুক্ত খাবার প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে চর্বি শোষিত হয়ে খাবারের স্বাদ ও গঠন বদলে দিতে পারে। মাইগ্রেশন হলো প্লাস্টিকের রাসায়নিক খাবারে স্থানান্তরিত হওয়া। প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক সময়ের সঙ্গে খাবারে মিশতে পারে, এমনকি প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণাও চলে আসতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, তাই মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সাধারণ প্লাস্টিকে মোড়ানো খাবার গরম করা মোটেই উচিত নয়, যদিও ওভেন-উপযোগী প্লাস্টিক ভিন্ন বিষয়। পারমিয়েশন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিকের ভেতর দিয়ে গ্যাস বা তরল চলাচল করে। বাইরের অক্সিজেন খাবারে ঢুকে চর্বিযুক্ত পদার্থে র‍্যান্সিডিটি তৈরি করতে পারে, ফলে বাজে গন্ধ ও বিস্বাদ হয় এবং কখনো ক্ষতিকর রাসায়নিকও তৈরি হয়। প্লাস্টিসাইজার নামক রাসায়নিক প্লাস্টিককে নমনীয় করে, তবে পিভিসি মোড়কে থাকা ডিইএইচএ খাবারে মিশতে পারে দীর্ঘ সংস্পর্শে বা উচ্চ তাপে। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলডিপিই সাধারণত এমন প্লাস্টিসাইজারমুক্ত থাকে। পলিইথিলিন চর্বির প্রতি আকর্ষণীয় হওয়ায় চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে শোষণ সমস্যা হতে পারে। প্লাস্টিকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে, যা অক্সিজেনজনিত ক্ষয় রোধ করে, কিন্তু তাপ বা চর্বির উপস্থিতিতে তা খাবারে চলে যেতে পারে। খাবার ও প্লাস্টিকের সরাসরি সংস্পর্শ কমাতে জৈব আবরণ নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে সব আবরণ সমান কার্যকর নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সাল থেকে খাদ্য সংস্পর্শে আসা উপকরণে বিসফেনল-এ (বিপিএ) নিষিদ্ধ করেছে এবং ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এর গ্রহণযোগ্য দৈনিক মাত্রা কমিয়েছে। তবে প্লাস্টিক একেবারে খারাপ নয়—এটি খাবারকে জীবাণু, বাতাস ও আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে, ফলে খাদ্য অপচয় কমে। সঠিক ব্যবহারই আসল কথা। খাবার ও প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো, ঢাকার সময় সামান্য ফাঁকা রাখা, চর্বিযুক্ত বা গরম খাবারে বিশেষ সতর্কতা এবং মাইক্রোওয়েভে শুধু অনুমোদিত প্লাস্টিক ব্যবহার করা উচিত। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো কাচ বা সিরামিক পাত্রে খাবার গরম করা।