সাধারণত কোটিপতি বা বিলিয়নিয়ারদের জীবন বলতে আমরা বুঝি অঢেল বিলাসিতা, ব্যক্তিগত জেট এবং রাজকীয় প্রাসাদ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মিটজি পারডুর জীবন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ১০ বিলিয়ন ডলারের 'পারডু ফার্মস' এবং ১২ বিলিয়ন ডলারের 'শেরাটন হোটেলস' গ্রুপের বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাধারণ ও মিতব্যয়ী জীবনযাপন করেন।

মিটজি জন্মগ্রহণ করেন শেরাটন হোটেল পরিবারের সন্তান হিসেবে। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি এবং তাঁর ভাইবোনরা তাদের বাবা আর্নেস্ট হেন্ডারসনের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণভার লাভ করেন। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী ফ্রাঙ্ক পারডু, যাকে আমেরিকার 'চিকেন কিং' বলা হতো, তাঁর মৃত্যুর পর পারডু ফার্মসের বিশাল সম্পদের সাথে মিটজির সম্পদের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালেই এই প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মিটজি বিলাসিতাকে গুরুত্ব দেন না। ২০২৫ সালের জুন মাসে 'ফরচুন'-এর এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, হেন্ডারসন এবং পারডু—উভয় পরিবারই তাকে অপচয় করতে উৎসাহিত করেনি। তাঁর মতে, দামী ডিজাইনার পোশাক পরলে কেউ প্রশংসা করে না, বরং অন্যের সেবা করলেই প্রকৃত সম্মান পাওয়া যায়।

৮৫ বছর বয়সী এই নারী বর্তমানে একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন এবং দৈনন্দিন চলাচলের জন্য সাবওয়ে ব্যবহার করেন। তিনি নতুন জুতা কেনার পরিবর্তে মোচি দিয়ে পুরনো জুতা মেরামত করে পরেন এবং বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বদা ইকোনমি ক্লাস বেছে নেন। নিউইয়র্কের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে তিনি মেরিল্যান্ডের স্যালিসবারির একটি মধ্যবিত্ত অ্যাপার্টমেন্টে দীর্ঘ ১৪ বছর বাস করেছেন, যেখানে তাঁর প্রতিবেশী হিসেবে নার্স এবং পুলিশ অফিসারদের মতো সাধারণ মানুষ থাকেন। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত জেটে যাতায়াত করলে বাস্তব পৃথিবীর প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব হয় না।

মিটজি পারডু কেবল সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে বসে থাকেননি, বরং তিনি একজন সাংবাদিক এবং কৃষি গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কৃষিকাজে আগ্রহী হন এবং ক্যালিফোর্নিয়া-ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জমি কিনে কৃষি পরীক্ষার সুযোগ করে দেন। পরবর্তীতে তিনি কৃষি পদ্ধতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে শুরু করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চলের মানবিক সহায়তার জন্য তাঁর স্বামী প্রদত্ত ১.২ মিলিয়ন ডলারের এনগেজমেন্ট রিং বিক্রি করে দেন। বর্তমানে তিনি ইউক্রেনের ট্রমা ভিক্টিমদের জন্য একটি এআই (AI) ট্রমা থেরাপিস্ট তৈরির কাজ করছেন।

বিলিয়নিয়ার হয়েও কেন তিনি সাধারণ জীবন বেছে নিলেন, সে প্রশ্নের উত্তরে মিটজি বলেন, কেবল গ্রহণ করার মধ্যে কোনো সুখ নেই, প্রকৃত আনন্দ পাওয়া যায় দেওয়ার মধ্যে। তিনি মনে করেন, যারা নিজেদের সম্পদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে দায়িত্বশীল থাকেন, তাদের পারিবারিক ব্যবসা দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাঁর দর্শন হলো—সুখী হতে হলে অন্যের জন্য কিছু করতে হবে, আর হতাশ হতে হলে কেবল নিজের অধিকারের কথা ভাবতে হবে।