সকালের পরিচিত রুটিনে মুখ ধোয়া বা দাঁত মাজার মতো সাধারণ কাজের পাশাপাশি একটি ছোট্ট ব্যায়াম যোগ করলে তা ভবিষ্যতের বার্ধক্যকালীন জীবনকে সহজ করে তুলতে পারে। অর্থোপেডিক সার্জন ডা. জসলিন উইটসেইনের মতে, দাঁত মাজার সময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস শরীরের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি এমন একটি কৌশল যেখানে একটি সাধারণ কাজের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে জুড়ে দেওয়া হয়, ফলে আলাদা করে ব্যায়ামের জন্য বাড়তি সময় বের করার প্রয়োজন হয় না।
এই প্রক্রিয়ায় দাঁত মাজার সময় কিছুক্ষণ এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণেই অন্য পায়ে ভর দিতে হয়। এক পায়ে দাঁড়ানোর সময় শরীরকে স্থির রাখতে গোড়ালি, পায়ের ছোট পেশি এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। চোখ, স্নায়ুতন্ত্র, জয়েন্ট ও পেশির এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘প্রোপ্রিওসেপশন’ বলা হয়। এর মাধ্যমে শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝতে পারে তার অবস্থান কোথায় এবং নিজেকে সোজা রাখতে কীভাবে ভার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সাধারণত আমরা সুস্থ বার্ধক্যের কথা চিন্তা করলে রক্তচাপ, হৃৎপিণ্ড বা হাড়ের শক্তির দিকে নজর দিই, তবে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি এবং প্রতিক্রিয়ার গতি হ্রাস পায়, যার ফলে সিঁড়ির ধাপে বা ভেজা মেঝেতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন দুর্ঘটনা তাদের দৈনন্দিন স্বাধীনভাবে চলাফেরার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই সুস্থ বার্ধক্যের অর্থ কেবল রোগমুক্ত থাকা নয়, বরং শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা।
ভারসাম্যের সাথে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে ২০২২ সালে ৫১ থেকে ৭৫ বছর বয়সীদের ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, যারা এক পায়ে ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি, তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, একে সরাসরি আয়ু কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি শরীরের সামগ্রিক সক্ষমতা বা বয়সজনিত পরিবর্তনের একটি সংকেত মাত্র। তাই এই ১০ সেকেন্ডের পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে শরীরকে বোঝার উপায় হিসেবে দেখা উচিত।
যারা এই অভ্যাসটি শুরু করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ হলো প্রথম দিন থেকেই দীর্ঘ সময় এক পায়ে না দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড দিয়ে শুরু করা। ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হলে শুরুতে দেয়াল বা টেবিলের মতো কোনো শক্ত কিছুর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে এবং পরে ধীরে ধীরে সেই সহায়তা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে যাদের ভারসাম্য অত্যন্ত দুর্বল বা অতীতে বারবার পড়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের একা এই অনুশীলন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্যস্ত জীবনে জিমে যাওয়া বা কঠোর ডায়েট মেনে চলা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে দাঁত মাজার সময়টুকুতে করা এই সামান্য বিনিয়োগ ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হাঁটাচলা এবং অন্যের সাহায্য ছাড়াই দৈনন্দিন কাজ করার আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। ছোট ছোট অভ্যাসই হতে পারে একটি সুস্থ ও স্বাবলম্বী বার্ধক্যের বড় প্রস্তুতি।



