র্যাপার ম্যাকলমোর সম্প্রতি এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ পড়েন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফিলিস্তিনপন্থী মন্তব্য করার জেরে তাকে কনসার্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ঘোষণা করেন, এই ট্যুর থেকে তার সমস্ত নেট আয় ফিলিস্তিনের ত্রাণ তহবিলে দান করবেন। বুধবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আলোচনাকে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনার’ লক্ষ্য নিয়েই এই সিদ্ধান্ত। এর আগে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চারজন সহশিল্পী সংহতি জানিয়ে কনসার্ট থেকে সরে দাঁড়ান, এবং কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল।
দান পাওয়া ছয়টি সংস্থার মধ্যে রয়েছে মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস, প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ড এবং জাতিসংঘের প্যালেস্টাইন শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ। এছাড়া আনোরা নামের আরেকটি সংস্থাও এই তালিকায় রয়েছে। সংস্থাগুলোর নেতারা বলছেন, অর্থের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্বিষহ জীবনযাত্রার প্রতি নতুন করে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে, যা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আনোরার ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী অ্যালিসিয়া ফিলিপস ম্যান্ডাভিল বলেন, ‘এমনকি যদি প্রতি রাতে বোমা না পড়ে, তবুও ধ্বংসস্তূপ সেখানে রয়েই যায়। আহত শিশুরাও এখনও সেই আঘাত বহন করছে।’
প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ডের কৌশলগত যোগাযোগ পরিচালক তারেক হাইলাত জানান, গাজা থেকে প্রতিনিয়ত ফোন আসছে — মানুষ রক্তক্ষরণ অবস্থায় সাহায্য চাইছে। তিনি বলেন, ‘অনেকে মনে করেন যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। প্রতিদিন শিশুরা মারা যাচ্ছে। আমাদের দলও প্রতি মুহূর্তে বিপদের মুখে কাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে এই মনোযোগ পাওয়া সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি অভিযানে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। পশ্চিম তীরে হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। পানি সংকটও প্রকট। জুলাইয়ে বিশ্বের শীর্ষ খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা সতর্ক করেছিল যে, ইসরায়েল আরও সহায়তা অনুমোদন করলেও গাজার বেশিরভাগ পরিবার পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ড চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় যেসব শিশু প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না, তাদের অন্যত্র নিয়ে যায় এবং বিদেশি চিকিৎসকরা গাজায় এসে চিকিৎসা দেন।
ম্যাকলমোরের এই অনুদান সংস্থাগুলোকে নমনীয়ভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেবে বলে জানিয়েছেন তারা। আনোরার ম্যান্ডাভিল বলেন, ‘মানুষের জীবনযাত্রা এবং আমাদের কাজের নিয়ম যখন প্রতি মাসে বদলে যায়, তখন এই নমনীয়তা জরুরি।’ গত বছর বন্যা হলে বা তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
এটি প্রথমবার নয় যে ম্যাকলমোর ফিলিস্তিনি সংস্থাগুলোকে দান করছেন। এর আগে তার প্রতিবাদী গান ‘হাইন্ডস হল’ এবং ‘হাইন্ডস হল ২’-এর রয়ালটি ইউএনআরডব্লিউএ-তে দান করেছিলেন। ইউএনআরডব্লিউএ-র মার্কিন শাখার প্রধান নির্বাহী মারা ক্রোনেনফেল্ড জানান, এই রয়ালটি থেকে পাঁচ লাখ নয় হাজার ডলারের বেশি সহায়তা এসেছে। তিনি বলেন, ‘ম্যাকলমোর ইতিমধ্যেই সম্ভবত গাজায় কয়েক লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে অবদান রেখেছেন।’
এই নতুন অনুদান আরও দানকে উৎসাহিত করছে। ইউটিউব তারকা ও সংগীত শিক্ষক মিসেস র্যাচেল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন, তিনি প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ডে ১০ লক্ষ ডলার দান করবেন এবং অন্যদেরও একই পরিমাণ দান করার আহ্বান জানান। নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফট — যার ক্রাফট গ্রুপ গিলেট স্টেডিয়ামেরও মালিক, যেখানে এড শিরানের কনসার্ট হওয়ার কথা — বুধবার এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বলেন, তিনি শিরানের নিজের ২০ লক্ষ ডলার দানের সাথে মিলিয়ে আরও ২০ লক্ষ ডলার দেবেন। তবে কোন সংস্থাকে এই অর্থ দেওয়া হবে তা উল্লেখ করেননি।
ম্যাকলমোরের দাবি, তাকে কনসার্ট থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে ক্রাফটের নেতৃত্বে একটি প্রচেষ্টা ছিল। ক্রাফট সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ম্যাকলমোরের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং ‘আরও ব্যাপক ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ও চিত্রকল্পের ইতিহাসের’ কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়। ম্যাকলমোর অবশ্য বলেছেন, ইসরায়েলি সরকারের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
মিসেস র্যাচেলের মতো সাধারণ দাতারাও এগিয়ে আসছেন। অনলাইন প্রগ্রেসিভ ইনফ্লুয়েন্সাররা প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ডের জন্য আরও ৭২ হাজার ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছেন। আনোরা জানিয়েছে, বুধবার সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া দান এই মাসের দৈনিক গড়ের তিন গুণের বেশি। ম্যাকলমোরের পোস্টে ট্যাগ করার পর সংস্থাটি ৮ হাজারের বেশি নতুন ফলোয়ার পেয়েছে। ম্যান্ডাভিল আশা করছেন, এই পরিচিতি নতুন তরুণ দাতাদের সংগঠনের কাজের সাথে যুক্ত করবে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, আমাদের ঐতিহ্যবাহী দাতারা ‘থ্রিফ্ট শপ’ গানের কথা জানেন না।’ ইউএনআরডব্লিউএ-র ক্রোনেনফেল্ড বলেছেন, অক্টোবর ২০২৩ থেকে তাদের সংগঠনে ২ লাখ ৩ হাজার নতুন দাতা যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি পাঠানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা যত্নশীল বলেই দান আসছে। ম্যাকলমোরের অত্যন্ত মানবিক এই অঙ্গীকার তা আরও বাড়িয়ে তুলবে।’




