ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পোড়াবাড়িয়া গ্রাম এখন দেশজুড়ে পরিচিত পরচুলা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে। ফেলে দেওয়া মানুষের চুল সংগ্রহ করে এখানে তৈরি হচ্ছে নানা মানের উইগ, যা পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের ২২টি দেশে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন হাজারো নারী, তাঁদের কারও কারও জীবনে এসেছে আমূল পরিবর্তন।

চার বছর আগে শিরিন আক্তারের সংসার ছিল চরম সংকটে। স্বামী তাইজুল শেখ ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গাছ থেকে পড়ে ডান হাত ও পা ভাঙেন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে ধারদেনা ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়, একপর্যায়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার লাখ টাকা। তিন সন্তান নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন—এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল তাঁর। এরই মধ্যে গ্রামে একটি কারখানা চালু হওয়ার খবর পান তিনি। কৌতূহল থেকে কারখানাটি ঘুরে দেখতে যান, সেখানে প্রায় ২০০ নারীকে পরচুলা তৈরির কাজ করতে দেখে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘হেয়ার কোট’ কারখানায় যোগ দেন। প্রথম মাসে বেতন পান ছয় হাজার টাকা, এখন মাসে আয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা কমছে, সংসারে ফিরেছে স্বস্তি।

পোড়াবাড়িয়া গ্রামে ২০০৭ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে পিবাড়িয়া গ্রুপ। বর্তমানে এই গ্রুপের অধীনে ১৮টি কারখানা রয়েছে—ঢাকায় ছয়টি, ময়মনসিংহে সাতটি, শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও নীলফামারীতে বাকিগুলো। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের ৯০ শতাংশই নারী। শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার জন্য তিনটি পিকআপ ভ্যানের ব্যবস্থা আছে, যাতে কোনো খরচ লাগে না। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, পোড়াবাড়িয়া ছাড়াও গফরগাঁওয়ের আরও ১৫টি গ্রামের নারীরা এখানে কাজ করেন।

পরচুলা তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সূক্ষ্ম। প্রথমে দেশের বিভিন্ন সেলুন, বিউটি পার্লার ও গ্রামগঞ্জের হকারদের কাছ থেকে ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করা হয়। হকারদের কাছ থেকে আকার ও মানভেদে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা কেজি দরে কেনা হয়। এরপর চুল বাছাই, পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও রং করার পর তৈরি হয় পরচুলা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘নটিং’—যেখানে চুলের গুচ্ছ ক্যাপের সঙ্গে হাতে গিঁট দিয়ে বসানো হয়। একটি পরচুলা তৈরি করতে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন এক দিন থেকে সর্বোচ্চ চার দিন সময় লাগে। মানভেদে একটি পরচুলার উৎপাদন খরচ ২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

শ্রমিকদের মজুরি নির্ভর করে কাজের পরিমাণের ওপর। মাসে একজন নারী ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। আকারভেদে একটি পরচুলা তৈরি করে ১ হাজার ১০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পাওয়া যায়। একই কারখানায় কাজ করা সাথী আক্তার জানান, এখন তাঁর মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। নিজের আয় দিয়ে তিনি বাড়িতে টিউবওয়েলের মোটর লাগানো, ফ্রিজ কেনাসহ নানা কাজ করেছেন। আরেক শ্রমিক মাফিয়া আক্তার নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কাজে যোগ দেন, পরে কারখানায় কাজ করতে করতেই এসএসসি পাস করেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা।

কারখানার প্রশিক্ষক হোসনা আক্তার পাঁচ বছর ধরে নতুন শ্রমিকদের কাজ শেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই এখানে পরচুলা তৈরি হয়, তবে পুরুষদের জন্য বিভিন্ন আকারের পরচুলার চাহিদা বেশি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানের সঙ্গে আয়ের সুযোগ থাকায় এ অঞ্চলে আত্মনির্ভরশীল নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গফরগাঁও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে প্রশিক্ষণ দেয়, পরে দক্ষতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দেয়। চাইলে কেউ কারখানায় এসে কাজ করতে পারেন, আবার অনেকে বাসায় বসেও কাজ করেন।

রপ্তানির দিক থেকে এই শিল্প এখন উল্লেখযোগ্য অবস্থানে। পিবাড়িয়া গ্রুপের তৈরি পরচুলা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, চিলি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, জার্মানি, ইতালি, জাপান, মাল্টা, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, সৌদি আরব, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক ও ইয়েমেন—এই ২২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ১৮টি কারখানা থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলারের (প্রায় ২৪ কোটি টাকা) পরচুলা রপ্তানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি পরচুলার দাম ২২ ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০০ ডলার পর্যন্ত।

পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামানের বাড়ি পোড়াবাড়িয়া গ্রামেই। তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পরচুলা কারখানা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০০৭ সালে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছোট পরিসরে কারখানা চালু করেন। লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মানের উইগ তৈরি। এখন এই শিল্পের সঙ্গে প্রায় দুই হাজার মানুষ যুক্ত। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে হিউম্যান হেয়ার উইগের বড় বাজার রয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। ভবিষ্যতে আরও প্রায় ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কাঁচামাল আমদানি সহজ করা, জাহাজে পরিবহন খরচ ও সময় কমানো এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতে সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।