চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে অনিরাপদ পানি, পানির সংকট, লবণাক্ততা এবং দুর্বল স্যানিটেশনব্যবস্থার কারণে কলেরা ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে ২০২৩ সালে মাত্র দেড় মাসে প্রায় আট হাজার মানুষ তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য রয়েছে।

গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চন্দ্রনগরের একটি কলোনিতে হঠাৎ ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়লে দুই দিনে অন্তত ১৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। এ ঘটনায় আবদুল মতিন (৭৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের বেশিরভাগই একই কলোনির বাসিন্দা, যাদের অভিযোগ—পানির ট্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার ছিল এবং ভেতরে মৃত ইঁদুর ও তেলাপোকা পাওয়া গেছে। পরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা ট্যাংকের পানি পরীক্ষা করেন এবং অপরিচ্ছন্ন পানি থেকেই রোগটি ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এর আগে ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত চট্টগ্রামে তীব্র ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবে ৭ হাজার ৯৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। নগরের পাশাপাশি বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশে তখন রোগীর সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যায়। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষকরা এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিস্তর অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন যে, একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ কারণ একই সময়ে বিদ্যমান ছিল—যার মধ্যে রয়েছে অনিরাপদ ও লবণাক্ত পানি, পানির সংকট, দুর্বল স্যানিটেশন এবং পানি বিশুদ্ধ না করে ব্যবহার। তবে এগুলোর কোনো একটিকেই এককভাবে প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি।

গবেষণাটি গত ২৫ জুলাই আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়েছে। আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১ জন গবেষক এই কাজে অংশ নেন। গবেষক দলের সদস্য ইমামুল মুনতাসির জানান, তাদের অনুসন্ধানে নলকূপ ও পুকুরের পানিতে দূষণের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। কোনো কোনো পুকুরে শৌচাগারের বর্জ্য সরাসরি মিশতেও দেখা গেছে, আবার অনেক মানুষ পানি বিশুদ্ধ না করেই ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, ‘নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি থেকেই যাবে।’

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬৬ জন রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৭০ জন নগরের এবং ৯৬ জন উপজেলার বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪০ বছর। ১৬৬ জনের সবারই পাতলা পায়খানা হয়েছিল, আর ৮৫ শতাংশের বমি হয়েছিল। ২৩ জনের মলের নমুনা পরীক্ষায় ৬ জনের শরীরে ভিব্রিও কলেরি বা কলেরার জীবাণু পাওয়া যায়, যা মহামারি সৃষ্টিকারী ‘ও ১ ও গাওয়া’ ধরনের। তবে রোগী ও পানিতে পাওয়া জীবাণুর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক যাচাইয়ে জিনগত পরীক্ষা করা হয়নি।

বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডী থেকে আটটি পানির নমুনা সংগ্রহ করে আইসিডিডিআরবির পরিবেশ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। তিনটি নলকূপের দুটিতে বিপুল পরিমাণ কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়, যার একটি নলকূপের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে কলিফর্ম ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার। পাঁচটি পুকুরের সব কটিতেই কলিফর্মের উপস্থিতি ছিল, একটিতে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ২ লাখ ৩০ হাজার। সব কটি পুকুর এবং একটি নলকূপে ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়াও পাওয়া গেছে, তবে সেগুলো সাধারণত মহামারি আকারে কলেরা ছড়ায় না।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬০২ জন। মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৩২৫ জন আক্রান্ত হচ্ছেন, আর শুধু আগস্টে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৮১ জন। গবেষকরা চট্টগ্রামে ডায়রিয়া বাড়ার দুটি মৌসুম চিহ্নিত করেছেন—এপ্রিল থেকে জুন এবং আগস্ট থেকে অক্টোবর, যা শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, পানিবাহিত রোগ ঠেকাতে সবার আগে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে—শুধু পান করার নয়, রান্না ও খাবার তৈরির পানিও। গ্রামাঞ্চলে নলকূপ বসানোর সময় শৌচাগার থেকে নিরাপদ দূরত্ব রাখা এবং বাসাবাড়ির পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন তিনি। কোনো এলাকায় হঠাৎ ডায়রিয়া রোগী বাড়লে শুধু চিকিৎসা নয়, ওই এলাকার পানির উৎস ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।