সকালের নরম রোদ ছুঁয়ে লাল শাপলার পাপড়িতে যে ঝিলিক পড়ে, তা দেখতে ভিড় জমান বহু দর্শনার্থী। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের এই বিলে এখন প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ আসেন। শুক্র ও শনিবার সেই সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চারটি নির্দিষ্ট স্পট থেকে অর্ধশতাধিক নৌকা পর্যটকদের বিল ঘুরিয়ে দেখায়। স্থানীয় মাঝি চয়ন হাওলাদার জানান, শাপলা ফোটার মৌসুমে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আসেন; পর্যটকের ভিড় বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির ব্যবসাও জমে ওঠে। তাদের হিসাবে, এই নৌকাগুলো থেকে সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা আয় হয়। অর্থাৎ একসময়ের জলাভূমি আজ পর্যটনের কারণে তৈরি করেছে আলাদা অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।

সাতলা বিল মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমি। বর্ষার পানিতে জুলাই থেকে ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা, যা নভেম্বর পর্যন্ত থাকে। সাদা ও বেগুনি শাপলাও আছে, তবে সংখ্যায় কম। বিলের আয়তন প্রায় ২০০ একর, কিন্তু বর্ষায় আশপাশের গ্রাম ও প্লাবনভূমি মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার একর এলাকা শাপলায় ঢেকে যায়। সারা বছর পানি থাকলেও বর্ষায় প্রাণ ফিরে আসে, আর শরতে সেই প্রাণ হয়ে ওঠে লাল শাপলার রাজ্য।

এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে জীবিকার এক বিচিত্র গল্প। নৌকার বইঠা হাতে যিনি পর্যটক ঘোরান, তাঁর কাছে এটি মৌসুমি রোজগার। বিলের পানিতে নেমে শাপলা তোলা নারীদের কাছে ফুল মানে সংসারের বাজার খরচ। গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা প্রতিদিন বিকেলে বিলে নেমে শাপলা সংগ্রহ করেন। পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করে তাঁদের আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করেই চলে তাঁদের সংসার। স্থানীয় শতাধিক পরিবার শাপলা সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। এসব শাপলা উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ ও বরিশাল শহরের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়; এমনকি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ও রাজধানীর বাজারেও।

পর্যটনের সুবিধা পৌঁছাচ্ছে শাপলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন, এমন মানুষের কাছেও। বিলের আশপাশে খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল ছুটির দিনে বেড়ে যায়। স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটকের ভিড় বাড়লে খাবারের বিক্রি বাড়ে, ফলে সাময়িক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। প্রবীণ আবদুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, ছোটবেলা থেকে এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখছেন; আগে মানুষ তেমন আসতেন না, এখন দূরদূরান্ত থেকে পর্যটক আসেন। সাতলার পরিবর্তন এখানেই—জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রেখে বিলকে আরও পর্যটকবান্ধব করতে উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত বছর ১৫ লাখ টাকা ও চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্পে পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ভিউ পয়েন্ট তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই বিলকে পর্যটকবান্ধব করা হচ্ছে; পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য যাতে পানিতে না পড়ে, সেজন্য প্রতিটি নৌকায় বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে এবং একাধিক মনিটরিং টিম কাজ করছে।

তবে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ কম নয়। স্থানীয় প্রবীণ আবদুর রহিমের অভিযোগ, পর্যটক ও ভিডিও নির্মাতাদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্যে বিলের পরিবেশ হুমকির মুখে। পরিবেশবাদীরাও একই সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, সাতলাকে মানসম্মত পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ জরুরি; পাশাপাশি প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যেন বিলে না ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।