সাতক্ষীরার বাঁকাল এলাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া ঘেরা এক ছোট্ট হোটেল। সাইনবোর্ডে লেখা—‘মাথায় তৈল দেন, গামছা নিন, গোসল করুন, ভাত খান। পয়সা থাকলেও খাবেন, না থাকলেও খাবেন।’ হোটেলটির নাম ‘গরীবে নেওয়াজ’। মালিক আবদুর রশীদ সরদার (৬৮) জানান, পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, ক্ষুধার কথা জানালে কাউকে খালি পেটে ফিরতে হয় না।
গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি কাঠের টেবিলের পাশে প্রায় ১০টি প্লাস্টিকের চেয়ার সাজানো। এক পাশে রাখা হয়েছে ভাত ও নানা পদ। পাশের ঘরে কড়াইয়ে ডাল ও ডিম রান্না করছিলেন রশীদের স্ত্রী ফজিলা খাতুন (৫৯)। খাবার দেখিয়ে রশীদ সরদার বলেন, ‘আজ আছে মাছ, ডিম, পুঁইশাক, কচুশাক, আলু ভর্তা। প্রতিদিন সাত-আট ধরনের খাবার হয়, কোনো দিন ১০ ধরনেরও হয়। কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী ২০ বা ৫০ টাকা দেয়, আবার কেউ টাকা ছাড়াই খেয়ে যায়। আমি কাউকে ফিরাই না।’
হাসপাতালের পাশে হওয়ায় প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে। কেউ রোগী, কেউ রোগীর স্বজন, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ ভিক্ষুক। চিকিৎসার খরচ জোগাড় হলেও অনেকের খাবারের টাকা থাকে না। তাঁদের জন্যই হোটেলের দরজা সব সময় খোলা। কিছুক্ষণ পর এক নারী এসে বলেন, ‘কাকা, আজ ভাত-তরকারি নিয়ে যাব।’ রশীদ নিজ হাতে খাবার প্যাকেট করে দেন। ওই নারীর স্বামী নজরুল ইসলাম হাসপাতালে ভর্তি। খাবার দিয়ে রশীদ বলেন, ‘কোনো কিছুর দরকার হলে আমার কাছে এসো। থাকার জায়গা, খাওয়াদাওয়া—যা দরকার, আমি যতটুকু পারি ব্যবস্থা করব।’ শুধু খাবার নয়, দূর থেকে আসা কেউ চাইলে গামছা ও তেলও দেন তিনি। পাশের পুকুরে গোসলের সুযোগও রয়েছে।
শৈশবেই মা-বাবাকে হারান রশীদ। অভাবের সঙ্গে বেড়ে উঠতে গিয়ে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার কুড়িয়ে খেতে হয়েছে। ডাবের শাঁস, কাঁঠালের বীজ, আলু সেদ্ধ—এসব খেয়েই দিন কেটেছে। টোকাই হিসেবে পরিচয় দিতে হয়েছে। পরে ঢাকায় বাসচালকের সহকারীর কাজ করেছেন। সে দিনগুলোর কথা মনে করে চোখ ভিজে যায় তাঁর। থেমে থেমে বলেন, ‘গরিব মানুষের কষ্ট আমি বুঝি। ক্ষুধার যে কষ্ট, সেটা আমি জানি।’
২০১২ সালে মাত্র ৩৫০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হয় এই হোটেল। ঢাকার গাবতলীতে কাজ করার সময় স্ত্রী পিঠা বিক্রি করতেন। বড় ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সাতক্ষীরায় চলে আসেন তাঁরা। প্রথমে অন্যের গোয়ালঘরে থাকতে হয়েছে। পরে সড়কের পাশে টিনের চালা তৈরি করে কয়েকটি চেয়ার ও টেবিল কিনে ভাতের হোটেল চালু করেন। প্রথম দিকে দৈনিক ৮০–৯০ টাকা বিক্রি হতো, কখনো ১০০–১৫০ টাকা। লাভ সামান্য থাকলেও হোটেল বন্ধ করেননি। রশীদ বলেন, ‘ওই ৩৫০ টাকা আর অনেক কষ্টের ওপর ভর করেই আজকের হোটেল দাঁড় করিয়েছি।’ এখন মানুষ খেয়ে যা দেয়, তা দিয়েই পরদিনের বাজার হয়।
১৪ বছর ধরে রান্নার কাজ সামলাচ্ছেন ফজিলা খাতুন। রাত তিনটায় উঠে রান্না শুরু করেন। ‘শরীর আর আগের মতো নেই, তবু ক্রেতারা আমার রান্না ছাড়া খেতে চায় না। কষ্ট হলেও রান্না করি, মানুষকে খাওয়াই।’ স্বামীর এই উদ্যোগকে বড় করে দেখেন তিনি। হোটেলের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে রশীদের বিশ্বাস। ছোটবেলা থেকেই খাজা মঈনুদ্দীন চিশতিকে ভালোবাসেন তিনি। গরিব-অসহায় মানুষের সেবার জন্য চিশতি ‘গরিবে নেওয়াজ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা থেকেই হোটেলের নাম ‘গরীবে নেওয়াজ’।




