২০১২ সালে সিরিয়ায় নিখোঁজ হওয়া মার্কিন সাংবাদিক অস্টিন টাইসের অপহরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘ এক মাস ধরে পরিকল্পিত একটি অপারেশন। বিবিসির একটি নতুন পডকাস্ট এবং দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারণা করা হয়েছিল যে, টাইস হয়তো কোনো সরকারি চেকপোস্টের সামনে ভুলবশত পড়ে গিয়ে অপহৃত হয়েছিলেন, কিন্তু নতুন প্রমাণ বলছে পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত।
তদন্তে জানা গেছে, টাইস যাকে বিশ্বাস করতেন এবং যার গাড়িতে চড়ে যাতায়াত করতেন, সেই চালকই আসলে আসাদ সরকারের হয়ে তথ্য পাচারকারী ছিলেন। ওই চালক ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস (এনডিএফ)-এর একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য সকর রুস্তমকে জানান যে, টাইস বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গিয়ে বিরোধী শিবিরের বিষয়ে প্রতিবেদন লিখছেন। সকর রুস্তম ছিলেন আসাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত নিরাপত্তা প্রধান বাসসাম আল-হাসানের ভাগ্নে। বাসসাম আল-হাসান এই তথ্য প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে জানান এবং আসাদ নির্দেশ দেন, "তাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসো।"
তদন্তের অংশ হিসেবে এনডিএফ-এর সাবেক সদস্য আবু আলির সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তার মতে, টাইসকে অবিলম্বে ধরে না ফেলে চালক তাকে আরও কিছুদিন নজরদারি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন যাতে তার গতিবিধি আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। টাইস যেহেতু মার্কিন মেরিনস ক্যাপ্টেনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছিলেন, তাই বিদ্রোহী যোদ্ধাদের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তার কিছু পরামর্শ দেওয়াকে গোয়েন্দারা সিআইএ-এর এজেন্টের লক্ষণ হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন, যদিও মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি টাইস কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন না।
২০১২ সালের ১১ আগস্ট নিজের ৩১তম জন্মদিন উদযাপনের পর যখন টাইস লেবাননের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন চালক তাকে দমাস্কাসের উপকণ্ঠে তাহৌনাহ নামক একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর চালক আচমকা বন্দুক বের করলে টাইস প্রথমে তা বিশ্বাস করেননি। এমনকি তিনি তার চেকবুক বের করে মুক্তিপণ বা অর্থের বিনিময়ে মুক্তি পাওয়ার আকুতি জানান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনডিএফ সদস্যরা তাকে অপহরণ করে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। এই অপহরণের পর প্রেসিডেন্ট আসাদকে তৎক্ষণাৎ জানানো হয় যে মার্কিন সাংবাদিককে ধরা হয়েছে।
বছরের পর বছর রহস্যে ঘেরা থাকা ওই চালকের পরিচয় অবশেষে বেরিয়ে এসেছে। তার নাম হামিদ আবু ওবেইদ, যিনি হোমসের বাসিন্দা। তার পরিবার জানিয়েছে, গাজা থেকে আসা ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করতেন এবং তাদের সিরিয়ান নাগরিকত্ব ছিল না। টাইসকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে সিরিয়ান নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট এবং একটি বাড়ির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি কেবল একটি পিস্তল পেয়েছিলেন।
আসাদ সরকারের পতনের পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন হামিদ আবু ওবেইদ। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, কেউ একজন তাকে মার্কিন দূতাবাসের কাছে এই তথ্য ফাঁস করে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল। এরপর একদিন কেনাকাটা করতে গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। দীর্ঘ ১২ বছর পর আসাদের পতনের সময় হাজার হাজার কারাবন্দী মুক্তি পেলেও টাইস ফিরে আসেননি। কিছু সাবেক কমান্ডারের দাবি তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তবে তার মরদেহ এখনও পাওয়া যায়নি। সিরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নথিতে টাইসকে আটকে রাখার চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার বর্তমান অবস্থা এখনও অজানা। ফলে টাইসের পরিবার এবং তার বিশ্বাসঘাতক চালকের পরিবার—উভয় পক্ষই এখন তাদের নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ করছে।




