প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পরিযায়ী পাখিরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়ে যায়। তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে শহরের কৃত্রিম আলো তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশচুম্বী ভবন এবং উজ্জ্বল আলোর আকর্ষণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে অন্তত ১০০ কোটি পাখি ভবনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শরতের মাইগ্রেশন বা পরিযায়ী পাখিদের চলাচল শুরু হয়েছে, যেখানে এবার ৩০ কোটির বেশি পাখি আকাশে উড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাখিদের এই যাত্রা নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের বাড়ি ও ভবনের আলো নিভিয়ে বা কমিয়ে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে শিকাগো ও মিনিয়াপোলিসের মতো শহরগুলোতে এই আহ্বান জানানো হয়েছে। বুনো পাখি সংরক্ষণ সংস্থা অডুবন সোসাইটির পরামর্শ অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা শ্রেয়। এছাড়া ভবন মালিকদের সাজসজ্জার আলো নিভিয়ে রাখতে এবং প্রয়োজনে মোশন সেন্সর ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটি বার্ড অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক জেসিকা উইলসনের মতে, খারাপ আবহাওয়ায় পাখিরা দিক হারিয়ে উঁচু ভবনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। আবার উজ্জ্বল আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা কাঁচের জানালার দিকে উড়ে যায় এবং স্বচ্ছ কাঁচ বুঝতে না পেরে সেখানে ধাক্কা খেয়ে আহত বা মৃত হয়। শুধু নিউইয়র্ক শহরেই প্রতি বছর এভাবে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পাখির মৃত্যু ঘটে। ওয়াইল্ড বার্ড ফান্ডের তথ্যমতে, ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের কাছে আসা ৪৫৩টি পাখির মধ্যে ১২৪টি জানালার কাচে ধাক্কা খেয়ে আহত হয়েছিল। এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা জানালার কাচে নকশাযুক্ত বিশেষ ফিল্ম বা আবরণ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে পাখিরা বাধাটি সহজেই বুঝতে পারে।
গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য মিনেসোটা ও মিশিগানে সবচেয়ে বেশি পাখির দেখা মিলতে পারে। এরপর তারা ইলিনয় ও ইন্ডিয়ানা হয়ে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলো পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে যাত্রা করবে। পারডু ইউনিভার্সিটির গবেষক ডিলান অস্টারহাউসের মতে, উত্তর গোলার্ধের আকাশে এই সময়ে ৫০ কোটির বেশি পাখি উড়তে পারে। সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এই যাত্রা শেষ হয়।
পাখিদের এই পরিযানের ধরন ও সময় আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। পারডু ও কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা আবহাওয়ার রাডার এবং কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিশেষ মডেল তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে পাখির চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। কালোপোল ওয়ার্বলার, চিমনি সুইফট এবং স্কিসর-টেইলড ফ্লাইক্যাচারের মতো শত শত প্রজাতি উষ্ণ আবহাওয়া ও খাবারের সন্ধানে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। মূলত নিজেদের বংশধর টিকিয়ে রাখা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়েই পাখিদের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঘটে থাকে।




