পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রশস্ত বালুচর গত কয়েক বছরে মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সৈকতের অন্তত ১৫টি অংশে তীব্র ভাঙন ধরেছে। কোথাও বালুচরে দীর্ঘ খালের মতো জলধারা তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঢেউয়ের ক্রমাগত আঘাতে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধগুলো ছিঁড়ে গিয়ে বালু বেরিয়ে আসছে, যার ফলে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং বালিয়াড়ির সাথে সাথে হাজার হাজার ঝাউগাছ সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
সৈকতের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় এই সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট। লাবণী পয়েন্টে দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে ব্যবসা করা মফিজুর রহমান জানান, গত পাঁচ বছরেই প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সমুদ্রগর্ভে চলে গেছে। তিন দশক আগে সমুদ্রের পানি এখনকার তুলনায় অনেক দূরে ছিল। কিটকট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, ভাঙন ও গর্তের কারণে পর্যটকদের হাঁটাচলা ও গোসলের জায়গা কমে গেছে। অনেক পর্যটকের অভিযোগ, বাস্তবের এই বিপর্যস্ত চিত্র তাদের প্রত্যাশার সাথে মেলে না, এমনকি বালুচরের গর্তে পা আটকে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাও ঘটছে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিয়েছে; জোয়ারের সময় পর্যটকদের চেয়ার-ছাতা জিও ব্যাগের বাঁধের ওপর সরিয়ে নিতে হয়, যা পর্যটকদের জন্য অসুবিধাজনক।
গবেষণার তথ্যে এই ভাঙনের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি বিলীন হয়েছে, যেখানে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে মাত্র ২৮৪ হেক্টর। অর্থাৎ ক্ষয়ের পরিমাণ পলি জমার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। সিইজিআইএস-এর গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারে বছরে গড়ে ৫.০৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭.৫ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। ভাঙনের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের হস্তক্ষেপকেও দায়ী করা হয়েছে। একটি গবেষণায় জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ২০ শতাংশ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ১৭.৮ শতাংশ এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ১৫.৬ শতাংশ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা জিও ব্যাগের ওপর নির্ভরতাকে অকার্যকর বলে মনে করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন রোধে সাগরলতা ও নিশিন্দার মতো উপকূলীয় উদ্ভিদ লাগিয়ে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হক সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বাঁশ ও কাঠের খুঁটি ব্যবহারের কথা বললেও স্থায়ী সমাধানের জন্য গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন। সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. আবদুল কাইয়ুম 'ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট' বা সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করেছেন, যার মধ্যে নিয়মিত বালি পুনঃস্থাপন (বিচ নরিশমেন্ট) এবং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্পের জন্য ডিপিপি (DPP) তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই ভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে জলবায়ুবিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী কয়েক দশকে এই পর্যটন শহরটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।




