বালু আর তপ্ত বাতাস — মরুভূমি বলতে সাধারণত এমন চিত্রই মনে পড়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মরুভূমির সংজ্ঞা অনেক বিস্তৃত। মূলত বছরে যে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ২৫ সেন্টিমিটার (১০ ইঞ্চি) বা তার চেয়েও কম হয়, সেটিই মরুভূমি হিসেবে গণ্য হয়। এই কঠিন জলবায়ুতে টিকে থাকা অত্যন্ত দুরূহ — তবুও বিভিন্ন জীব ও মানবগোষ্ঠী এখানে নিজেদের অভিযোজিত করেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি হিসেবে পরিচিত সাহারা। ৯.৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (৩.৬ মিলিয়ন বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি ছুঁতে পারে। এত তীব্র গরমেও সাহারার বুক চিরে বেঁচে আছে জলপাইগাছ, অ্যান্টিলোপ, জেরবোয়া, বিচ্ছু, জাকাল এবং হায়েনার মতো প্রাণী। উত্তর আফ্রিকার তুয়ারেগ বা পূর্ব ও মধ্য সাহারার টেডা সম্প্রদায়ের মতো যাযাবর পশুপালকরা এখানে বসবাস করে। মিসরের কায়রো, লিবিয়ার ত্রিপোলি এবং মালির তিমবুকতুর মতো বড় শহরগুলোও সাহারা অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত।

সাহারার চেয়েও বিশাল এক মরুভূমি রয়েছে পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে — অ্যান্টার্কটিকা। ১৪.২ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (৫.৫ মিলিয়ন বর্গমাইল) আয়তনের এই অঞ্চলটি গ্রহের সবচেয়ে শীতল মরুভূমি। আর্কটিকের চেয়েও বেশি ঠান্ডা এখানকার আবহাওয়া; তাপমাত্রা -৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-১২৮.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। গড়ে ৩.৫ কিলোমিটার (১.৫ মাইল) পুরু বরফের চাদরে ঢাকা এই মহাদেশে কোনো স্থানীয় মানববসতি নেই। তবে জলবায়ু, ভূত্বকবিদ্যা, জীববিজ্ঞানসহ নানা গবেষণার জন্য একাধিক দেশ এখানে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান করে হাজারো গবেষক কাজ করছেন। উদ্ভিদের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণে অ্যান্টার্কটিকার প্রাণীকুল মূলত মাংসাশী — পেঙ্গুইন, আলবাট্রস, তিমি ও সিলের মতো প্রাণীরা সেখানকার বাসিন্দা। এর আশপাশের জলরাশিতে মাছ, ক্রিল ও সামুদ্রিক স্পঞ্জের প্রাচুর্য রয়েছে।

ঠান্ডা মরুভূমির আরেকটি উদাহরণ হলো উত্তর চীন ও দক্ষিণ মঙ্গোলিয়া জুড়ে বিস্তৃত গোবি মরুভূমি। হিমালয়ের বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে অবস্থিত এই মরুভূমির ভূদৃশ্য মূলত বালু দিয়ে নয়, বরং পলিস্তরযুক্ত শিলা দিয়ে গঠিত। এখানে ঘাসযুক্ত স্তেপ অঞ্চলও রয়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি বৃষ্টি হয়।

সাহারা, অ্যান্টার্কটিকা বা গোবির মতো অঞ্চলকে কেন মরুভূমি বলা হয় — তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। উত্তরটি সহজ: এই সব অঞ্চলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টিপাত হয় ২৫ সেন্টিমিটারের কম, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর টিকে থাকাকে কঠিন করে তোলে। তবে অতীতের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনটি মরুভূমিতেই জীবাশ্মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত করে যে একসময় সেখানে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস ছিল। বিশেষ করে গোবির মঙ্গোলিয়া অংশটি অন্ত ক্রিটেশিয়াস যুগের জীবাশ্মে সমৃদ্ধ — এই অঞ্চল একসময় সবুজে ভরা ছিল বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক