কল্পনা করুন, শীতের এক সকালে আপনার রান্নাঘরের টেবিলে একটি তামার টুকরো রাখা আছে, যার তাপমাত্রা পরম শূন্যের মাত্র কয়েক ডিগ্রি উপরে অর্থাৎ প্রায় মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী মনে হতে পারে, এই অতিশীতল বস্তুটি মুহূর্তেই পুরো ঘরকে বরফে পরিণত করবে। তবে বাস্তব বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এই তামার টুকরোটি পরিবেশ থেকে তাপ শোষণ করতে শুরু করবে এবং ততক্ষণ উষ্ণ হবে যতক্ষণ না এটি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছায়।

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, তাপ সর্বদা উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিম্ন তাপমাত্রার দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে ঘরের বাতাস, টেবিল, দেয়াল এবং অন্যান্য আসবাবপত্র থেকে তাপ ওই অতিশীতল তামার টুকরোটিতে প্রবেশ করবে। তাপ সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়াটি প্রধানত তিনটি উপায়ে ঘটে: প্রথমত, টেবিলের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত, পরিচলনের মাধ্যমে যেখানে ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আসে এবং উষ্ণ বাতাস তার জায়গা নেয়; এবং তৃতীয়ত, বিকিরণের মাধ্যমে, যেখানে ঘরের চারপাশের বস্তুগুলো অবলোহিত রশ্মির আকারে শক্তি পাঠায়।

এই প্রক্রিয়ার সময় কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটতে পারে। বাতাসের জলীয় বাষ্প অতিশীতল পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে দ্রুত ঘনীভূত হয়, যার ফলে তামার টুকরোটির চারপাশে সাদা বরফের আস্তরণ বা কুয়াশার মতো মেঘ তৈরি হতে পারে। এমনকি তাপমাত্রা যথেষ্ট কম হলে বাতাসের নাইট্রোজেন (মাইনাস ১৯৬° সেলসিয়াস) এবং অক্সিজেন (মাইনাস ১৮৩° সেলসিয়াস) তরল বা কঠিন অবস্থায় জমাট বাঁধতে পারে। তবে এই শীতল প্রভাবটি কেবল বস্তুর খুব কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থাকে।

একটি সাধারণ ঘরকে ঠান্ডা করার ক্ষমতা ওই ক্ষুদ্র তামার টুকরোর নেই। এর মূল কারণ হলো 'তাপধারণ ক্ষমতা'। যদিও অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় তামার তাপধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়, কিন্তু একটি ঘরের বাতাস এবং দেয়ালের সম্মিলিত তাপধারণ ক্ষমতা তার তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে তামার টুকরোটি কিছু তাপ শোষণ করলেও পুরো ঘরের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসবে না।

নিরাপত্তার কথা বলতে গেলে, এমন অতিশীতল বস্তু খালি হাতে স্পর্শ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা এবং বস্তুর তাপমাত্রার বিশাল পার্থক্যের কারণে ত্বকের আর্দ্রতা মুহূর্তেই জমে গিয়ে গুরুতর টিস্যু ড্যামেজ বা 'ফ্রস্টবাইট' ঘটাতে পারে, এমনকি ত্বক বস্তুর সাথে আটকে গিয়ে ছিঁড়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এই অতিশীতল তাপমাত্রাকে কাজে লাগান আধুনিক প্রযুক্তিতে। যেমন, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটগুলোকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় রাখা হয় যাতে তাপীয় গোলযোগ কমে। অনেক ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা মহাকাশের গড় পটভূমি তাপমাত্রা (২.৭ কেলভিন)-এর চেয়েও কম হয়। অন্যদিকে, মানুষের শরীরের অধিকাংশ পানি দিয়ে গঠিত হওয়ায় জীবন্ত মানুষকে পরম শূন্যের কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এতে কোষের গঠন স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তবে ক্রায়োনিক্স গবেষণায় মৃতদেহ সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়, যদিও পুনরুজ্জীবনের কোনো প্রমাণিত পদ্ধতি এখনও নেই।

পরিশেষে, পরম শূন্য তাপমাত্রা (০ কেলভিন বা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) হলো তাপমাত্রার সর্বনিম্ন সীমা, যেখানে কণাগুলোর তাপীয় গতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। যদিও এই সীমায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব, তবে এমআইটি বা জার্মানির ব্রেমেন শহরের বিজ্ঞানীরা পিকোকেলভিন স্তরের অতিশীতল তাপমাত্রা তৈরি করে বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।