কেন অনেক ক্ষেত্রে ১,০০০ টাকার বদলে পণ্যের মূল্য ৯৯৯ টাকা লেখা হয়? গাণিতিক হিসেবে ১,০০০ এবং ৯৯৯ টাকার পার্থক্য মাত্র এক টাকা, যা মোট দামের ০.১ শতাংশেরও কম। তবে ক্রেতাদের মানসিকতায় এই সামান্য পার্থক্যের প্রভাব হয় অনেক গভীর। বিপণন বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ পদ্ধতিটিকে বলা হয় 'জাস্ট-বিলো প্রাইসিং' এবং যেসব মূল্যের শেষ সংখ্যা ৯ হয়, তাকে অভিহিত করা হয় 'চার্ম প্রাইসিং' হিসেবে।

এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো মানুষের সংখ্যা পড়ার একটি বিশেষ প্রবণতা, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'লেফট ডিজিট ইফেক্ট' বা বাঁদিকের অঙ্কের প্রভাব। মানুষ যখন কোনো পণ্যের দাম দেখে, তখন সাধারণত বামদিকের প্রথম সংখ্যাটির দিকে বেশি নজর দেয় এবং দ্রুত একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পণ্যের দাম যদি ২৯৯ টাকা হয় এবং অন্যটির ৩০০ টাকা হয়, তবে প্রথমটির ক্ষেত্রে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত '২০০' সংখ্যাটিকে প্রাধান্য দেয়, যদিও প্রকৃত দাম প্রায় ৩০০ টাকাই। ফলে ক্রেতার মনে হয় পণ্যটি ২০০ টাকার কাছাকাছি, অথচ ৩০০ টাকার পণ্যটির ক্ষেত্রে প্রথম সংখ্যাটি '৩' হওয়ায় তা অনেক বেশি মনে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন দামের প্রথম সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়, তখনই এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়। যেমন ৩৫৯ এবং ৩৬০ টাকার ক্ষেত্রে প্রথম সংখ্যা একই হওয়ায় তেমন কোনো বড় পার্থক্য অনুভূত হয় না।

২০০৫ সালে বিপণন গবেষক মানোজ থমাস ও ভিকি মরউইৎজ 'পেনি ওয়াইজ অ্যান্ড পাউন্ড ফুলিশ: দ্য লেফট-ডিজিট ইফেক্ট ইন প্রাইস কগনিশন' শিরোনামে পাঁচটি পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ করেন যে, দামের প্রথম অঙ্ক বদলে গেলে ক্রেতারা বাস্তবের চেয়ে বেশি পার্থক্য অনুভব করেন। এছাড়া আশপাশের অন্যান্য পণ্যের দামের তুলনার ওপর ভিত্তি করে এই প্রভাবের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। শুধু দাম দেখার সময়ই নয়, বরং দাম মনে রাখার ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা কাজ করে। ১৪৯৯ টাকা দামের একটি পণ্য মানুষ অনেক সময় '১৪০০-এর কিছু বেশি' হিসেবে মনে রাখে, কিন্তু ১৫০০ টাকা হলে তা সরাসরি '১৫০০' হিসেবেই স্মৃতিতে থাকে।

দীর্ঘদিন ধরে ই-কমার্স এবং অফলাইন শপিংয়ে ৯ দিয়ে শেষ হওয়া দামকে বিশেষ অফারের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ক্রেতাদের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এখন ৯ দিয়ে শেষ হওয়া দাম দেখলেই অবচেতন মনে সেটি সস্তা বলে মনে হয়। তবে বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করেছেন যে, ৯ দিয়ে শেষ হওয়া মানেই যে পণ্যে প্রকৃত ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা নয়; এটি মূলত ক্রেতাকে আকর্ষণ করার একটি কৌশল মাত্র। আসল ছাড় জানতে হলে পূর্বের দাম বা সমজাতীয় পণ্যের মূল্যের সাথে তুলনা করা প্রয়োজন।

তবে এই কৌশলের ফলে বিক্রি সবসময় বৃদ্ধি পায় না। ২০২৩ সালে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত ৬৯টি গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯৯৯ টাকা দাম রাখলে ক্রেতার আকর্ষণ সামান্য বাড়লেও সামগ্রিক প্রভাব খুব বেশি নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে পূর্ণ সংখ্যায় (যেমন ১০০০) দাম লেখা হলে ক্রেতারা পণ্যটিকে উচ্চমানের বলে মনে করেন। তবে গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে, ৯ দিয়ে শেষ হওয়া দামের পণ্যগুলো নিম্নমানের হয়। মূলত ক্রেতার কেনাকাটার উদ্দেশ্য এবং পণ্যের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এই কৌশলের কার্যকারিতা ভিন্ন ভিন্ন হয়। যারা সাশ্রয়ী কেনাকাটা করতে চান, তাদের কাছে এই কৌশল বেশি কার্যকর হয়।