ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটিয়ে নগদ অর্থের নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চালু হওয়া ‘বাংলা কিউআর’ সেবাটি বর্তমানে আশানুরূপ গতিতে এগোচ্ছে না। শুরুতে বেশ আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেলেও সম্প্রতি এর লেনদেনের পরিমাণে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২০-৩০ কোটি টাকা, যা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বেড়ে ১৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে এরপরই শুরু হয় নিম্নমুখী প্রবণতা এবং অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তা কমে দাঁড়ায় ১১৯ কোটি টাকায়। গত ২৪ সপ্তাহের মধ্যে সাত সপ্তাহ লেনদেনের চিত্র নেতিবাচক ছিল।

লেনদেনের এই আকস্মিক পতনের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে মার্চেন্টদের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন। জুলাই মাসে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার পর অনেক বিক্রেতা বা মার্চেন্ট তাদের এক অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একাধিক ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান থেকে কিউআর কোড সংগ্রহ করেন। অক্টোবর থেকে মার্চেন্টদের অর্থ গ্রহণের খরচ শূন্য করে দেওয়ায় গ্রাহক ও বিক্রেতা উভয়েই এমএফএস এজেন্টের বদলে মার্চেন্ট পয়েন্ট থেকে বিনামূল্যে নগদ টাকা তুলতে শুরু করেন। এতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ক্ষতি হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দেয় যে, কেনাকাটার পরিবর্তে কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করলে সংশ্লিষ্ট হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই কঠোর পদক্ষেপের পর থেকেই লেনদেনের গতি কমতে শুরু করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, লেনদেনের গতি হ্রাসের নির্দিষ্ট কারণটি তারা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, তবে বাধা দূর করে সেবাটিকে সর্বজনীন করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, এই খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিকাশ ও নগদের মতো জনপ্রিয় এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই সেবা জনপ্রিয় করা কঠিন। এছাড়া ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর জটিলতা এবং ইন্টারনেট ছাড়াই কিউআর ব্যবহারের ঘোষণার বাস্তবায়ন না হওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে।

তবে লেনদেন বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ প্রণোদনা পাচ্ছে। বর্তমানে নতুন মার্চেন্ট হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ইসলামী, পূবালী, জনতা, সোনালী ও রূপালী ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, তারা কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, যার ফলে হিসাব খোলা এবং লেনদেন ক্রমে বাড়ছে। তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির জন্য সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। চলতি মাস থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেনের সুযোগ চালু হলেও বড় ধরনের কোনো নতুন উদ্যোগ ছাড়া দ্রুত গতি ফিরে আসা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।