পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক ইংল্যান্ড সফর যেন এক বিশৃঙ্খল নাটকে পরিণত হয়েছে। আর এই দৃশ্য দেখে সাবেক প্রধান কোচ জেসন গিলেস্পির মনে হচ্ছে, তাঁর আগের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এই কিংবদন্তি পেসার ২০২৪ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান টেস্ট দলের দায়িত্ব নেন, কিন্তু মাত্র আট মাস পরেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের সাথে আলাপে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) ও বিশেষ করে প্রধান নির্বাচক আকিব জাভেদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সব অভিযোগ তুলেছেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেডিংলি ও লর্ডসে টানা দুই হারের পর পাকিস্তান দল থেকে সাতজন খেলোয়াড় ও একাধিক কোচকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বোর্ডের সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে বরখাস্ত হওয়া কিছু খেলোয়াড়কে রাজপরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য ক্ল্যারেন্স হাউসে পাঠানো হয়েছিল, যেন উপস্থিতি কম না দেখায়। গিলেস্পি বলেন, এই ঘটনাগুলো দেখে তাঁর কোনো বিস্ময় নেই, কারণ তিনি আগে থেকেই জানতেন পাকিস্তান ক্রিকেটের ভেতরটা কেমন।
দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল, তবে তিনি সুযোগটি গ্রহণ করেছিলেন বলে জানান গিলেস্পি। তাঁর ভাষ্য, পাকিস্তানের মতো ক্রিকেটমনা দেশের দায়িত্ব পাওয়া সম্মানের বিষয় ছিল। পিসিবি তাকে ফাস্ট বোলিং পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এমন পিচ তৈরির পরিকল্পনা ছিল যেখানে পেসাররা আধিপত্য করতে পারবে। কিন্তু আকিব জাভেদ প্রধান নির্বাচক হয়ে আসার পর সব চিত্র বদলে যায়। গিলেস্পি অভিযোগ করেন, আকিব সবকিছু নিজের হাতে নিয়ে নেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেন। কোনো বিষয়ে তাঁর মতামত নেওয়া হতো না।
“আমার মনে হতো উনিই সর্বেসর্বা। টেস্ট দল, খেলোয়াড় ও স্টাফদের দেখাশোনা, এমনকি দল নির্বাচনেও আমার ভূমিকা রাতারাতি খর্ব করা হয়।” গিলেস্পি আরও বলেন, আকিবের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এখানে যৌথ আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। “উনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এভাবে কাজ করতে হবে।’ আমি চুপ করে শুনলাম, কিন্তু পরে আপত্তি জানালে বুঝলাম, ওনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”
গিলেস্পি মনে করেন, পিসিবি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সমর্থনের কারণেই আকিব নিজেকে ‘অস্পৃশ্য’ ভাবতেন। “ওনার নীতি ছিল—আমার কথা মেনে নাও, নয়তো পথ মাপো। এমন পরিবেশে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কোনো মানুষ কাজ করতে চাইবে না।” তিনি আরও বলেন, আকিব তাঁর সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন যে তিনি ও গ্যারি কারস্টেন পাকিস্তানে পর্যাপ্ত সময় কাটাননি, তা সম্পূর্ণ ভুল। “পিসিবির সাথে আমাদের চুক্তিতে কী ছিল, তা নিয়ে নাক গলানো ওনার অনধিকার চর্চা। আমরা দুজনেই ট্রেনিং ক্যাম্প, ঘরোয়া ক্রিকেট দেখা ও সিরিজ প্রস্তুতির জন্য সময় দিতে প্রস্তুত ছিলাম। ম্যাচ না থাকলে বিদেশি কোচরা কিছুদিন বাড়ি যাবেন—এটাই স্বাভাবিক।”
নিজের শৈশবের আইডলদের কথা মনে করে গিলেস্পি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। “ওয়াসিম, ওয়াকার, আকিব—সবাইকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু আকিবকে কাছ থেকে দেখে সেই শ্রদ্ধা আর থাকে না। ‘নিজের নায়কদের সাথে বাস্তবে দেখা করতে নেই’ কথাটা সত্যি।”
বর্তমান সাদা বলের কোচ মাইক হেসনকেও পরামর্শ দিয়েছেন গিলেস্পি। তিনি বলেন, “মাইককে বলব, নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করো, কখনো হ্যাঁ-জি হুজুর টাইপ হয়ো না। ও দারুণ মানুষ, আশা করি বেতনের লোভে এই নোংরা চক্রে জড়াবে না।”
পিসিবি এখনো তাঁর হাজার হাজার ডলার পাওনা আটকে রেখেছে বলে জানান গিলেস্পি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, চাটুকারিতা করে সেই টাকা নেওয়ার প্রশ্ন নেই। “আমি কখনো নিজের নীতির সাথে আপস করিনি। চুপ থেকে বেতন নিতে পারতাম, কিন্তু জেসন গিলেস্পি সেই লোক নয়।” তিনি আরও বলেন, দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই তিনি জানতেন পেছনে আকিব কলকাঠি নাড়ছেন। “পাকিস্তানের ক্রিকেট মহলের মানুষই আমাকে সতর্ক করেছিলেন। আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার বন্ধ না করলে আমি আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবব।”
পাকিস্তান ক্রিকেটের এই ধ্বংসাত্মক চক্রের জন্য গিলেস্পি সরাসরি আকিব জাভেদকেই দায়ী করেন। তাঁর মতে, “আকিব যতক্ষণ থাকবেন, পাকিস্তান ক্রিকেট পেছনেই হাঁটবে। এখানে শক্ত ক্রিকেট মস্তিষ্কের নেতৃত্ব প্রয়োজন। যোগ্য কোচ আনুন, তাঁকে সময় দিন, আর কোচকেই অধিনায়ক বাছাইয়ের ক্ষমতা দিন। বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট কোনো ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে না, বরং অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।”
এ বিষয়ে আকিব জাভেদ বা পিসিবির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।




