টানা দুই হারে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের মূল পর্বে ওঠার আশা শেষ হয়ে যাওয়ার পরই দায়িত্ব হারান প্রধান কোচ জেরার্ড জোনস। সিরিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হারের পরদিন, ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। তবে বরখাস্তের চার দিন পর ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন এই মার্কিন কোচ। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি থেকে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি জানান, বাংলাদেশে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং মেরে ফেলার হুমকিও পেয়েছেন।

জোনস লিখেছেন, ফুটবলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করা ন্যায্য, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, তথ্য ফাঁস ও মৃত্যুর হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, আমি কিছু অত্যন্ত বাজে বার্তা পেয়েছি, আমার ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয়েছে এবং মেরে ফেলার হুমকিও পেয়েছি। আমি একজন স্বামী, একজন বাবা এবং একজন সন্তান—এমন মন্তব্যও ছিল তাঁর স্ট্যাটাসে।

এদিকে বাফুফের বিজ্ঞপ্তিতে জোনসকে সরানোর নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে বাফুফে। তবে বাফুফের একটি সূত্র জানিয়েছিল, গত ১৯ আগস্ট টিম হোটেলে সহকারী কোচ আতিকুর রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা এবং ফল বিপর্যয়ের জেরেই জোনসকে সরানো হয়েছে। সেদিন সহকারী কোচের সঙ্গে কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে পরিস্থিতি ধাক্কাধাক্কি পর্যন্ত গড়ায়। পরে জোনস নিজেই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন।

বাংলাদেশের হয়ে কাজ করার সময়টাকে শুধু ফলাফলের দৃষ্টিতে দেখতে রাজি নন জোনস। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে তিনি শুধু জাতীয় দলের ফলাফল নিয়েই কাজ করতে যাননি; যুব উন্নয়ন, কোচ তৈরি, প্রতিভা শনাক্তকরণ এবং প্রবাসী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করার মতো বৃহত্তর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় ছিল খুব কম—প্রায় ৯ সপ্তাহ। এরপরই তাঁকে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে খেলতে হয়। তাঁর মতে, প্রস্তুতির সময়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এমন দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যাদের ফুটবলার তৈরির কাঠামো অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত।

তবে অনুশীলনে দলের উন্নতিও দেখেছিলেন জোনস। বল দখল, আক্রমণে বৈচিত্র্য, বক্সে প্রবেশ, হাই প্রেসিং ও কাউন্টার প্রেসিংয়ে দল ভালো করছিল বলে দাবি তাঁর। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে সেই পরিকল্পনা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। তিনি বলেন, অনুশীলনে আমরা যে ফুটবল তৈরি করেছিলাম, মাঠে সেটি ধারাবাহিকভাবে খেলতে পারিনি; দলটি আমাদের প্রস্তুতির সময় যে নীতিগুলো তৈরি করেছিল, তার তুলনায় অনেকটাই অচেনা হয়ে গিয়েছিল।

দুটি ম্যাচের ফল দিয়ে নিজের দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারকে বিচার করতে চান না জোনস। প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সময়ের কাজ ও অর্জন দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফলে মুছে যাওয়ার নয়। বাংলাদেশের ফুটবলের কাঠামো নিয়েও নিজের মূল্যায়ন দিয়েছেন তিনি—এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে খেলোয়াড় বাছাই, অবকাঠামো, ফুটবল সংস্কৃতি ও উচ্চপর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরিতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। শেষে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও ফুটবলের জন্য শুভকামনা জানিয়ে জোনস বলেন, বাংলাদেশে প্রতিভা আছে, মানুষের ফুটবলের প্রতি আবেগ আছে। এখন সেই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সঠিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।