ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন আসর শুরু হচ্ছে আজ। তবে শুরুর আগেই সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে রিয়াল মাদ্রিদের কীর্তি স্পর্শ করতে পারবে কি না পিএসজি? লুইস এনরিকের দলটির সামনে সেই সুযোগ স্পষ্ট। তবে সেটি যে সহজ হবে না, তা বোঝা যায় সূচি দেখলেই।
বছর দুয়েক আগে উয়েফা যে ফরম্যাট চালু করেছে, এবার সেই নিয়মেই তৃতীয়বারের মতো আয়োজন হতে যাচ্ছে। ৩৬ দলের লিগ পর্বে প্রতিটি দলকে খেলতে হবে আটটি ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। চারটি ম্যাচ নিজেদের মাঠে, বাকি চারটি প্রতিপক্ষের মাঠে। আট রাউন্ড শেষে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ আট দল সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেবে। নয় থেকে ২৪ নম্বরে থাকা ১৬ দল খেলবে দুই লেগের প্লে-অফ, যেখানে টিকিট মিলবে বাকি আটটি। ২৫ থেকে ৩৬ নম্বরে থাকা দলগুলোর যাত্রা সেখানেই শেষ—ইউরোপা লিগে পড়ে যাওয়ার সুযোগটাও নেই আর। আগামী ৫ জুন মাদ্রিদের মেত্রোপোলিতানো স্টেডিয়ামে ফাইনাল দিয়ে মিলবে নতুন চ্যাম্পিয়নের মুকুট।
নতুন ফরম্যাটে এবার মূল পর্বে অভিষেক হচ্ছে চারটি ক্লাবের—কোমো, সাবাহ বাকু, এলএএসকে লিনৎস এবং ভাইকিং। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে নামকরণের পর এ নিয়ে মোট ১৬৩টি ক্লাব মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেল। ইতালির সিরি আ-তে গত মৌসুমে এসি মিলান ও জুভেন্টাসকে পেছনে ফেলে তৃতীয় হওয়া কোমো এখন সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের নেতৃত্বে ইউরোপেও নিজের সামর্থ্য দেখাতে চায়। অন্যদিকে ৬১ বছর পর অস্ট্রিয়ান লিগ জেতা এলএএসকে লিনৎস আর ৩৪ বছর পর নরওয়েজিয়ান লিগ জেতা ভাইকিং বাছাইপর্ব পেরিয়ে প্রথমবার মূল মঞ্চে নামছে। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটা আজারবাইজানের সাবাহ বাকুর—মাত্র ১০ বছর আগে জন্ম নেওয়া দলটি প্রথম বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে টানা ৮ ম্যাচের ৬টিতে জিতে মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘ বিরতির পর চেনা মঞ্চে ফেরার আনন্দও আছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে কনফারেন্স লিগের ফাইনাল খেলা রিয়াল বেতিস ২১ বছর পর মূল আসরে ফিরেছে। তুর্কি ক্লাব ফেনেরবাচে ২০০৮-০৯ মৌসুমের পর এই প্রথম মূল পর্বে খেলছে—মাঝে ১০ বার বাছাইপর্বেই থেমেছিল তাদের স্বপ্ন। গত মাসে অলিম্পিক লিওঁকে হারিয়ে ১৬ বছরের খরা কাটিয়েছে তারা। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ মৌসুমের পর প্রথমবারের মতো ফিরেছে গ্রিক ক্লাব এইকে এথেন্স ও ইতালির রোমা। দুই মৌসুমের বিরতি কাটিয়ে পোর্তো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও নতুন লিগ পর্বের যুগে পা রেখেছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে কিছু লড়াই এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে—রিয়াল-সিটি, লিভারপুল-রিয়াল, বায়ার্ন-পিএসজি, বার্সা-পিএসজি—কতবার দেখলেন দর্শকরা! কিন্তু এবারের সূচি বেশ কিছু অপ্রচলিত দ্বৈরথের সুযোগ এনে দিয়েছে। জানুয়ারির শেষে আতলেতিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হবে ফেনেরবাচে। পিএসজি-রোমা ম্যাচও নতুন রোমাঞ্চের নাম—ডিসেম্বরে প্যারিসে গিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের চ্যালেঞ্জ করবে ইতালীয় ক্লাবটি। সাবেক দুই চ্যাম্পিয়ন অ্যাস্টন ভিলা ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের লড়াইও এবারই প্রথম দেখবে ফুটবল বিশ্ব, আগামী জানুয়ারিতে ভিলা পার্কে।
আবেগ আর পুনর্মিলনের গল্পও কম নয়। বার্সেলোনায় ট্রফি ভরা ক্যারিয়ার কাটানো রদ্রি এবার বার্সার জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হচ্ছেন সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির। সেস্ক ফ্যাব্রেগাস কোমোর কোচ হয়ে ফিরবেন ক্যাম্প ন্যু-তে। পিএসজিতে যোগ দেওয়া ফেরান তোরেসও নিজের সাবেক ক্লাব বার্সার বিপক্ষে খেলার ভাগ্য এঁকেছে। আর জোসে মরিনহো—রিয়াল মাদ্রিদে দ্বিতীয় মেয়াদে কোচ হয়ে ইউরোপ-অভিযানের শুরুটাই আজ ইন্টার মিলানের বিপক্ষে। ২০১০ সালে ইন্টারকেই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে বায়ার্নকে হারিয়ে ইউরোপ জিতিয়েছিলেন এই পর্তুগিজ কোচ। তাঁর প্রিয় ক্লাব চেলসির স্ট্যামফোর্ড ব্রিজেও এবার পা পড়বে, যেখানে শাখতার দোনেৎস্ক নিজেদের হোম ম্যাচ খেলবে।
চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে টানা তিনবার ইউরোপ-সেরা হওয়ার কীর্তি শুধু রিয়াল মাদ্রিদেরই। জিদানের সেই দলের রেকর্ড ছোঁয়ার স্বপ্ন এখন লুইস এনরিকের পিএসজির। ঘরের মাঠে বার্সেলোনা, রোমা ও গালাতাসারাইয়ের মুখোমুখি হবে তারা। ভিয়ারিয়াল ও কোমোর বিপক্ষে খেলতে হবে প্রতিপক্ষের মাঠে। ইংলিশ দুই ক্লাব—ম্যানচেস্টার সিটি এবং গত আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে এনরিকের দলকে ঘাম ছুটিয়ে দেওয়া অ্যাস্টন ভিলা—তাদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। এ বছরই ব্যালন ডি’অর জয়ের আশা এমবাপ্পের, সেটাও তো পিএসজির অনুপ্রেরণা।




