রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওজনের বিভিন্ন অঞ্চলের লজিস্টিক কেন্দ্রে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ফলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণের ক্রাসনোদার, দাগেস্তান, স্তাভ্রোপোল এবং আদিগেয়া অঞ্চলে অবস্থিত গুদামগুলোতে হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে; এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্রাসনোদারে একটি হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে। শিশু অধিকার কমিশনার মারিয়া লভোভা-বেলোভা নিশ্চিত করেছেন যে নিহতদের বয়স ছিল ১৩, ১৫ ও ১৬ বছর; আরও ছয় শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দাগেস্তানের মাখাচকালায় ওজনের একটি লজিস্টিক কেন্দ্রে সোমবার স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটার দিকে (গ্রিনিচ মান সময় ২টায়) ড্রোন আঘাত হানে এবং সেখানে আগুন ধরে যায় বলে কোম্পানিটি জানায়। এর আগে কোম্পানিটি বলেছিল, ক্রাসনোদার শহরে—দাগেস্তানের ওই স্থান থেকে ৭০০ কিলোমিটার পূর্বে—অবস্থিত একটি কেন্দ্রে 'বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড' জ্বলছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আদিগেয়স্ক ও নেভিনোমিস্কে কর্মরত ওজনের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলো বিবিসি যাচাই করেছে। একটি ভিডিওতে ওরেনবুর্গ অঞ্চলে একটি গুদামে ড্রোনের সরাসরি আঘাত দেখা যায়; অন্য একটি ভিডিওতে দাগেস্তানের গুদাম থেকে ঘন ধোঁয়া ও আগুনের শিখা উপরের দিকে উঠতে দেখা যায়। এই হামলার একদিন আগে ওজনের সামারা অঞ্চলের একটি স্থানে আঘাত হানা হয়েছিল; সেখানেও কোম্পানির কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছিলেন। শনিবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছিল, দ্বৈত ব্যবহারের পণ্য সংরক্ষণের কেন্দ্রগুলোতে ধারাবাহিক হামলা শত্রুর সরবরাহ ব্যবস্থাকে জটিল করে তোলে এবং সামগ্রিকভাবে রাশিয়ার অর্থনীতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ওয়াইল্ডবেরিজের ১৫টি বৃহত্তম লজিস্টিক হাব হামলার পর এবার ওজনের পালা এসেছে বলে তারা জানায়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজকে লক্ষ্য করে আসছে; দেশটির সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতাকে কিয়েভ বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বর্ণনা করেছে, কারণ প্রতিষ্ঠানটি সামরিক উপাদান সরবরাহ করে বলে অভিযোগ—যদিও মস্কো তা অস্বীকার করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শনিবার বলেন, অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে ইউক্রেন 'প্যান্ডোরার বাক্স' খুলে দিয়েছে; রাশিয়া কিয়েভের 'সবচেয়ে সংবেদনশীল অর্থনৈতিক খাতগুলোতে' পাল্টা আঘাত হানবে। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আসছে; সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে গুদাম ও মালবাহী টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উভয় পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সোমবার সকালে মস্কোর শেয়ার বাজারে ওজনের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়; প্রধান শেয়ারহোল্ডার বেসরকারি ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠান এএফকে সিস্তেমার শেয়ারও প্রায় ১৩ শতাংশ পতন দেখায়। সরকার ওজনকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেবে কিনা—এই প্রশ্নে ক্রেমলিন জানিয়েছে, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করে এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার বিকল্প তৈরি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ওডেসা অঞ্চলে রাতের হামলায় খাদ্য সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়। অঞ্চলপ্রধান ওলেগ কিপার টেলিগ্রামে জানান, এতে পাঁচজন আহত হয়েছেন।
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ওজন রাশিয়ার প্রথম দিকের অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম। ওয়াইল্ডবেরিজের পরেই এর অবস্থান; সারা দেশে পণ্য সংগ্রহ ও বিতরণের কেন্দ্র ছড়িয়ে আছে। উভয় প্রতিষ্ঠানের লোগো প্রায়ই একই স্থানে পাশাপাশি দেখা যায়। এই খুচরা বিক্রেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধকে আরও নিকটবর্তী করেছে। 'রাশিয়ার অ্যামাজন' হিসেবে পরিচিত এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে দেশের অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় জনগোষ্ঠীর ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যবহার করে বলে ধারণা। দূরবর্তী এলাকায় যেখানে দোকানের অভাব, সেখানে পোশাক ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির জন্য মানুষ এদের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে অ্যামাজনের মতো সরাসরি পণ্য বিক্রি না করে, ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাজার হিসেবে কাজ করে—স্বতন্ত্র বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন, পণ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ এবং লেনদেন পরিচালনা করে। ফলে হামলায় হওয়া ক্ষতির বড় অংশই সেই ব্যবসাগুলোর উপর পড়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো সামরিক সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়—এই অভিযোগ ক্রেমলিন প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউক্রেনের ধারাবাহিক এই হামলায় বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করছে।




