নোয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সুবর্ণচর উপজেলায় ছায়াঘেরা একটি গ্রাম রয়েছে, যার নাম ‘ধানের শিষ’। পাকা সড়ক, সারি সারি গাছ আর বিস্তীর্ণ ধানখেত—চোখে পড়লেই মনে হবে শিল্পীর আঁকা ছবি। কিন্তু এই মনোরম নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত অতীত, যা স্থানীয় প্রবীণরা ভুলতে চান।
গ্রামটির বুক চিরে যাওয়া সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা বসতবাড়িগুলোর সামনে শোভা পাচ্ছে নানা গাছ। অদূরে মেঘনা নদীর চরে জেগে ওঠা এই গ্রামে কৃষিই প্রধান পেশা। মাছ, মুরগি ও গরুর খামার থেকে উৎপাদিত পণ্য জেলা শহরে পাঠানো হয়। প্রতিটি পুকুর যেন ছোট মাছের খামার। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা—শিক্ষার আলোও ছড়িয়ে পড়েছে। বেকার তরুণদের অনেকেই খামার গড়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন, প্রবাসী আয়ও সচ্ছলতা এনেছে।
কিন্তু এখানে বসতি স্থাপনের শুরুটা ছিল ভিন্ন। ১৯৫০-৫১ সালের দিকে মেঘনা নদীর ভাঙনে নোয়াখালীর পুরোনো শহর (বর্তমান সোনাপুরের দক্ষিণ অংশ) নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। সরকারি দপ্তরগুলো তখন মাইজদীতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬০ সালের দিকে পুরোনো শহরের দক্ষিণে নতুন চর জাগতে থাকে। ১৯৭৬-৭৭ সালে নদী গতিপথ বদলে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সরে যায়, মাঝখানে জেগে ওঠে বিশাল চরগুলোর একটি—আজকের ধানের শিষ গ্রাম।
প্রথমে চরটির নাম ছিল পোড়াচর। গ্রামের বাসিন্দা ৮৪ বছর বয়সী আমান উল্যাহ মাঝি জানান, ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে হাতিয়া উপজেলায় নদীভাঙনে তাদের বসতি ধ্বংস হলে তারা এই চরে আসেন। প্রায় ৪০০ পরিবার আশ্রয় নেয়, বেশিরভাগই হাতিয়া থেকে, কিছু সন্দ্বীপ, রামগতি ও কালামুন্সি থেকে। তখন নদী ছিল চর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে।
১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পার্শ্ববর্তী চরলক্ষ্মীর দখলদাররা অতর্কিত হামলা চালায়। আগুনে পুড়িয়ে দেয় সব ঘরবাড়ি, লুট করে ফসল ও গবাদিপশু। কুপিয়ে ও পিটিয়ে বহু নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় মামলা হলে ২১ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়। হামলার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকে চরে আসেন, জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তে পুলিশ ফাঁড়ি বসে। কিছুদিন পর হাতিয়া সফরে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি পোড়াচরের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এরপর জেলা প্রশাসন জরিপ চালিয়ে পোড়াচর মৌজার নাম রাখে ‘ধানের শিষ’, পাশের চরগুলোর নাম হয় চর বৈশাখী, ধানসিঁড়ি, ধানশালিক। ধীরে ধীরে মৌজার নামেই গ্রাম পরিচিতি পায়।
নাম পরিবর্তনের পর গ্রামটি এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৯১ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরে সরকারীকরণ হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ২৩০ শিক্ষার্থী রয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান। এছাড়া কয়েকটি নুরানি মাদ্রাসাও গড়ে উঠেছে। গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার, ভোটার প্রায় ৩ হাজার ২০০। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে মাহমুদুর রহমান নিশান জানান, তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে এখন স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবার সহাবস্থান রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শেখ রিপন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি কিছু লোক রাজনীতির পেছনে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি মনে করেন, গ্রামের পরিবেশ ঠিক রাখতে মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা জরুরি। ধানের শিষ গ্রামের অর্থনীতি এখন মাছ, মুরগি ও গরুর খামার, কৃষি ও প্রবাসী আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। সীমিত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও গ্রামটি ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে।



