বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিস্মরণীয় নাম। শুধু কবি নন, তিনি ছিলেন দ্রোহ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা পথ পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কিন্তু তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও রাজনৈতিক ব্যবহারের ইতিহাসও কম চর্চিত নয়। এর মধ্যে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত একটি ডাকটিকিটের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা কেবল ফিলাটেলিক ত্রুটি নয়, বরং তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের এক জ্বলন্ত নিদর্শন।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। অতিদরিদ্র পরিবারে তাঁর শৈশবের নাম ছিল 'দুখু মিয়া'। মাত্র নয় বছর বয়সে বাবা হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে। মক্তবে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা, সেই সঙ্গে মাজারের খাদেম, কবর সেবক ও মুয়াজ্জিনের কাজ—এসবের মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর শৈশব। পরে আঞ্চলিক লেটো দলে যোগ দিয়ে পালাগান, গান ও কবিতা রচনার মাধ্যমে সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ৪৯তম বাঙালি পল্টনের হাবিলদার হিসেবে করাচিতে কাটান কিছু দিন। সেনাবাহিনীর এই জীবনই তাঁর ভেতরের সাহিত্যিক সত্তাকে জাগ্রত করে।
১৯২০ সালে সেনানিবাস ভেঙে গেলে নজরুল চলে আসেন কলকাতায়। ১৯২০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। ১৯২১ সালে প্রকাশিত 'বিদ্রোহী' কবিতা তাঁকে এক রাতেই বিখ্যাত করে তোলে। শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর গর্জন বাংলার মানুষের মনে দাগ কাটে। তিনি ছিলেন প্রেম ও সাম্যের কবি; একজন মুসলিম হয়েও রচনা করেছেন অসংখ্য শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতি, আবার বাংলা ভাষায় ইসলামি গান ও কাওয়ালির ধারাও প্রবর্তন করেছেন। 'ও মোর রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ'—এই গান আজও ঈদ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বঞ্চিত করেছে। ডাকটিকিট প্রকাশের পরিসংখ্যানও তার প্রমাণ। এই চব্বিশ বছরে পাকিস্তান পোস্টাল সার্ভিস মোট ২৯৬টি ডাকটিকিট প্রকাশ করলেও পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস, ঐতিহ্য বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে ছিল মাত্র ৫১টি। পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্ব যাঁকে ডাকটিকিটের বিষয় করতে বাধ্য হয়েছিল, তিনি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু সেই স্বীকৃতিও আসে ১৯৬৮ সালে, পাকিস্তান সৃষ্টির দুই দশক পর।
নজরুলের ডাকটিকিট প্রকাশের পেছনে ছিল রাজনৈতিক চাপ। ১৯৫৮ সালে আল্লামা ইকবালের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ও ১৯৬৭ সালে তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে ডাকটিকিট প্রকাশের পর পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ ওঠে—পাকিস্তান কি কেবল ইকবালের? বাঙালি সাহিত্যিকদের কী কোনো মূল্য নেই? এই সমালোচনার মুখে পড়ে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে একজন বাঙালি কবিকে বেছে নেয়। নজরুলকে নির্বাচনের কারণ ছিল তাঁর করাচিতে সেনাজীবন কাটানো এবং পাকিস্তান সরকার তাঁকে 'সাহিত্যিক চিকিৎসা ভাতা' দিত।
নকশা অনুযায়ী ডাকটিকিটে লেখা ছিল 'BIRTH ANNIVERSARY OF KAZI NAZRUL ISLAM BORN 25TH MAY 1889'। কিন্তু নজরুলের প্রকৃত জন্মসাল ১৮৯৯ হওয়ায় কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে ত্রুটি ধরে ফেলে। সব ছাপা ডাকটিকিট বাতিল করে নতুন করে ছাপানো হয়, যাতে লেখা হয় 'KAZI NAZRUL ISLAM POET AND MUSICIAN (b. 25TH MAY 1899)'। প্রকাশের তারিখও পিছিয়ে ২৫ জুন করা হয়।
তবে সবচেয়ে বড় অপমান ছিল কবির কবিতার বিকৃতি। নজরুলের 'মানুষ' কবিতার প্রথম দুই লাইন—'গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!'—তাঁর স্মারক ডাকটিকিটে লেখা হয়েছিল 'গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে নাহি কিছু বড় নাহি কিছু মহীয়ান।' তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অজ্ঞতা ও অবহেলার এই নিদর্শন আজও ইতিহাসের সাক্ষী।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নজরুলকে ভারত থেকে সসম্মানে বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। শাসকদের বিকৃতি সত্ত্বেও ইতিহাস কবিকেই তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে। এই ডাকটিকিটের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব বৈষম্যের ঊর্ধ্বে শেষ পর্যন্ত জয় হয় মানুষের, জয় হয় সাম্যের।




