দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি বছরেই ইউপি নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরেই তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার মধ্যেই সরকার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে নির্বাচনযোগ্য ইউনিয়নের সংখ্যা মাত্র ৩১১টি। মেয়াদ শেষ না হওয়ায় ৪ হাজার ২৩৭টি ইউপিতে নির্বাচন সম্ভব নয়, আর ৪০টি ইউপিতে মামলা চলমান। এই পরিস্থিতিতে সরকার গত দুই মাসে অন্তত ৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। এর মধ্যে পুরোনো ইউনিয়ন ৩১টি এবং নবগঠিত ইউনিয়ন ৭টি। কোথাও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও বসানো হয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের। এমনকি ইউপির সদস্য (মেম্বার) পদেও দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, নাগরিক সেবা স্বাভাবিক রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসক নিয়োগে আইনগত কোনো বাধা নেই। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম গত ১৭ জুলাই সাংবাদিকদের জানান, চলতি বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রশাসক বসানো ও নির্বাচনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রশাসকের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, সেখানে ব্যক্তির নাম থাকে বলে কে সরকারি কর্মকর্তা আর কে রাজনৈতিক দলের নেতা, তা বোঝার সুযোগ থাকে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বহু ইউপি চেয়ারম্যান পালিয়ে যান। তখন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন জায়গায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রশাসক নিয়োগ করে। তবে তখন কোনো দলীয় নেতাকে এই পদে বসানো হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার কিছু ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, স্থানীয় বিএনপি নেতারা আরও ইউনিয়নে নিজেদের লোকদের বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে জুলাই মাসে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপির দলীয় নেতাদের এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া ১১টি সিটি করপোরেশন, ৬৩টি জেলা পরিষদ এবং ৮টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে প্রশাসক হিসেবে বিএনপি নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগের বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। বরগুনার বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া ইউনিয়নে গত মাসে প্রশাসক করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন খোকনকে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন এবাদুল হক, যিনি উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এবং ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদে গত ১৯ জুলাই বিএনপি নেতা মো. নূরনবী ভুঁইয়াকে প্রশাসক করা হয়েছে। একই সাথে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ১২ নেতা-নেত্রীকে পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার বরিশল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য ফজলুর রহমান ভূঁইয়া।

গত দুই মাসে যে ৩৮টি ইউপিতে প্রশাসক বসানো হয়েছে, তার ১৯টিই বরিশাল জেলায় — যা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি। বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুলাদি ও উজিরপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে। সেখানে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক বসানোর জন্য একাধিক বৈঠক হলেও কাকে বসানো হবে তা নিয়ে সমঝোতা হয়নি। বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান জানান, অনেক নেতাই প্রশাসক হতে চান, কিন্তু একজনকে দিলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হন। তাই কাউকে না দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, যদি নির্বাচন শিগগিরই হয়, তাহলে অল্প সময়ের জন্য প্রশাসক বসানোর প্রয়োজন নেই। সরকারি পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ বন্ধ করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক বসালে জনমনে ধারণা জন্মাতে পারে যে সব ইউনিয়নে নির্বাচন নাও হতে পারে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, একজন প্রশাসক এক মেয়াদে ১২০ দিনের জন্য নিযুক্ত হন এবং সরকার চাইলে এই মেয়াদ বাড়াতে পারে। এমনকি নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসকের মাধ্যমেই ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনা করার ক্ষমতাও সরকারের হাতে রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগের এই প্রবণতা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।