গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় ব্র্যাক ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিদেশফেরত প্রবাসীরা অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বৈধ ও দক্ষ অভিবাসন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে। অবৈধ ও সাগরপথে বিদেশযাত্রা রোধ করতে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনলাইন করা এবং ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গন্তব্য দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা না থাকলে কর্মী পাঠানো হবে না, যার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণার সুযোগ কমবে। এছাড়া প্রবাসীদের জন্য 'কল্যাণ কার্ড' চালু এবং বিদেশফেরত ব্যক্তিদের পেশা অনুযায়ী আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তার পরিকল্পনা করছে সরকার। মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় স্তরের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, অভিবাসন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এখানে অদক্ষতা এবং তথ্যসেবার অভাব প্রকট। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা পর্যায়ের মানুষ দালালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ফলে অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তিনি বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং 'সমুদ্রপথে বিদেশ না' স্লোগানের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথা বলেন। পাশাপাশি, বিদেশফেরত কর্মীদের, বিশেষ করে নারীদের জন্য মানসিক ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এটিএম মাহবুবুল করিম জানান, এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার বিদেশফেরত ব্যক্তিকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আরও সাড়ে চার লাখ মানুষকে এই প্রক্রিয়ায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এটিএম আবু আসাদ ই-পাসপোর্ট চালুর ফলে তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জালিয়াতি কমার কথা জানান। অন্যদিকে, এপিবিএন-এর ডিআইজি ড. মো. আল-মামুনুল আনছারী বিমানবন্দরে মানবপাচার রোধ এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে পুলিশের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি নুরুল কাদের এবং আইএলও-র মাহসিন হামুদা পুনর্বাসন কার্যক্রমকে কেবল প্রকল্পভিত্তিক না রেখে রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে টেকসই করার পরামর্শ দেন। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, বিদেশফেরত কর্মীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আর্থিক সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রবাস কল্যাণ ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তারা ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অভিবাসন ও পুনর্বাসন ঋণ প্রদান করেছেন।
বৈঠকে লিবিয়া ও কম্বোডিয়া ফেরত প্রবাসীরা তাদের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। হৃদয় চৌধুরী এবং তোফায়েল আহমেদ বর্ণনা করেন কীভাবে দালালের প্ররোচনায় তারা মানবপাচারের শিকার হন এবং চরম কষ্টের পর শূন্য হাতে দেশে ফেরেন।
আলোচনার শেষে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়, যার মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, অসাধু দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, রিক্রুটিং এজেন্সির সেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং নারী বিদেশফেরতদের জন্য বিশেষ সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনতে সরকারি নির্ধারিত সীমা কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।




