একসময় পালতোলা নৌকা, স্টিমার আর লঞ্চের আনাগোনায় মুখরিত ছিল নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মগড়া নদী। শহরের মোক্তারপাড়ার বাসিন্দা শ্যামলেন্দু পাল (৭৮) স্মৃতিচারণ করে জানান, ছয় দশক আগেও এই নদী ছিল প্রমত্ত, যেখানে বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বড় বড় মহাজনি নৌকা ধান-পাট বোঝাই করে যাতায়াত করত। তবে সময়ের সাথে সাথে দখল এবং চরম দূষণে সেই প্রাণবন্ত নদীটি এখন কেবলই স্মৃতি। বর্তমানে নদীটি নিশ্চল এবং অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

নদীর এই শোচনীয় অবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দুই পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। বাসাবাড়ি, বাজার ও কারখানার পাশাপাশি ক্লিনিকের বর্জ্য এবং পৌরসভার নর্দমার নোংরা পানি প্রতিনিয়ত নদীটিকে বিষিয়ে তুলছে, যার ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাস্তব চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শহরের আনন্দবাজার থেকে পাটপট্টি পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশে নদী দখল করে বসতবাড়ি ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সিএস খতিয়ান অনুযায়ী এখানে অন্তত ৩৮১টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, যদিও বিআরএস খতিয়ানে এই সংখ্যাটি ৪৯টি। এসব দখল খসিয়ে নিতে ইতোমধ্যে ১০৪টি উচ্ছেদ মোকদ্দমা এবং ২০টি দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুনমুন জাহান জানিয়েছেন, দ্রুতই এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।

এই বিপন্ন নদীকে পুনরায় সচল করতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের আওতায় ৪১ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন করা হবে এবং শহরের অংশে দুই পাড়ে হাঁটার পথ তৈরি করে সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে খননকাজ শুরু হবে, যা সাতটি আলাদা প্যাকেজে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরে আসবে, যা জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কৃষিকাজে সহায়তা করবে।

মগড়া নদীর ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ময়মনসিংহের ফুলপুরের ধলাই নদের দক্ষিণমুখী প্রবাহ থেকে এই নদীর উৎপত্তি। মোট ১৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীর ১১৬ কিলোমিটার অংশ নেত্রকোনা জেলায় এবং শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অংশটি প্রায় ৭ কিলোমিটার, যার গড় প্রস্থ ৩৮ মিটার। নদীটি নেত্রকোনা শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে এবং যোগাযোগের জন্য এখানে ছয়টি সেতু রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ১৯৬৫ সালে মোক্তারপাড়া সেতু নির্মাণের পর বড় নৌকার চলাচল কমতে শুরু করে এবং ৯ বছর আগে সেতুটি নতুন করে তৈরির পর নৌপথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

নদীর দূষণ রোধে চ্যালেঞ্জ আরও বেশি, কারণ সাতপাই চক্ষু হাসপাতাল মোড়, কালীবাড়ি ও থানা মোড়ের মতো এলাকায় প্রচুর বর্জ্য জমে আছে। পৌরসভার ১৩টি নর্দমার পানি সরাসরি নদীতে পড়ার পাশাপাশি অনেক বাড়ির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও এর সাথে যুক্ত। তবে নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, নদীটিকে দখলমুক্ত ও সংস্কার করে একটি আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে নদী খননে এবং বাকি অর্থ ব্যয় হবে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটার পথ ও নান্দনিক কাজে।