গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের এক জমকালো আয়োজন হয়েছে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন সুরমা নদীতে। গত শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে এই প্রতিযোগিতা, যাতে অংশ নেয় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ১২টি নৌকা। ঢাকঢোলের তালে তালে মাঝিদের হাঁকডাক, একসঙ্গে বইঠা চালানোর ছন্দ আর প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা নদীর পরিবেশ।
সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে জড়ো হতে শুরু করে হাজারো দর্শক। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের প্রতিবেশী জেলা হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা থেকেও অনেকে এসেছিলেন এই আয়োজন উপভোগ করতে। ধনপুর বাজার ও তার আশপাশের এলাকা যেন উৎসবের রূপ নেয়। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে; আবার অনেকে নৌকা ভাড়া করে নদীর মাঝখান থেকেই বাইচের আনন্দ উপভোগ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক বাড়িতেই ছিল অতিথিদের সমাগম।
প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে যায় সুরমা নদীর চিত্র। জয়ের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বইঠা চালাতে থাকেন মাঝিরা। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যায়, পরক্ষণেই প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকাটি তাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। নদীর দুই তীর থেকে দর্শকেরা পছন্দের নৌকাকে উৎসাহ দিতে হর্ষধ্বনি ও করতালিতে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন। অনেকেই মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দি করেন বাইচের দৃশ্য।
শুধু বিনোদনই নয়, এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। ধনপুর ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এই নৌকাবাইচের লক্ষ্য ছিল যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং হাওরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। হাওর-অধ্যুষিত ইটনার মানুষের জীবনের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক চিরন্তন। বর্ষায় বিশাল হাওর পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে যাতায়াতের প্রধান বাহন। সেই নৌকাকে ঘিরেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে নৌকাবাইচের প্রথা। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় আগের মতো নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন আর হয় না, ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ এই সংস্কৃতি।
২৫ বছর বয়সী আরাফাত ইসলাম ৩০ জনের একটি দল নিয়ে ইটনার আড়ালিয়া এলাকা থেকে নৌকায় চড়ে সুরমা নদীতে এই বাইচ দেখতে এসেছিলেন। তাঁর জীবনে এটাই প্রথম নৌকাবাইচ দেখা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাইচ চলবে বলে নৌকার ভেতরেই দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছিলেন তাঁরা, রান্নাও হয়েছিল নৌকাতেই।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা শাপলা বয়েজ ক্লাবের নৌকা। ইটনার ধনপুর ঘোষপাড়ার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা প্রথম স্থান অর্জন করে। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় 'সোনার হরিণ'। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় 'রুপার ময়ূর', আর তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের জন্য ছিল এলইডি টেলিভিশন। পুরস্কার হাতে পেয়ে বিজয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাসের বন্যা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ চন্দ্র দাস জানান, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি উৎসবে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকত। জারি-সারি-ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডি আর নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের মূল উৎস। কালের বিবর্তনে সেসব আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর এ ধরনের নৌকাবাইচ আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিল বলে মনে করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার এই গভীর সম্পর্ককে সামনে রেখে সুরমা নদীর এই নৌকাবাইচ শুধু একটি বিনোদন আয়োজন নয়, লোকজ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার একান্ত প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




